খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই জানুয়ারি ২০২৬, ২:৪৮ এএম

দেশের জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার মাঝেই নতুন সংকটের মেঘ ঘনীভূত হয়েছে। লভ্যাংশ বা কমিশন বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জরিমানা বন্ধসহ ছয় দফা দাবিতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ ও বিক্রি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে ‘এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড’। বুধবার সন্ধ্যায় সংগঠনের পক্ষ থেকে জারি করা এক জরুরি নোটিশে সারা দেশের পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের এই কঠোর সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এই ঘোষণার ফলে রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকটে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন সাধারণ ভোক্তারা।

আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও আল্টিমেটাম
বুধবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেয়। সংগঠনের সভাপতি সেলিম খান জানান, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কোনো কোম্পানির প্ল্যান্ট থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হবে না এবং মাঠ পর্যায়ে কোনো সিলিন্ডার বিক্রি হবে না। তবে বৃহস্পতিবার বেলা তিনটায় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সঙ্গে একটি বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। ওই বৈঠকে ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়া হলে ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হতে পারে, অন্যথায় আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

ব্যবসায়ীদের উত্থাপিত প্রধান দাবিগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| বিষয়ের বিবরণ | বর্তমান কমিশন (টাকায়) | প্রস্তাবিত দাবি (টাকায়) | বৃদ্ধির হার |
| পরিবেশক কমিশন | ৫০ টাকা | ৮০ টাকা | ৬০% |
| খুচরা বিক্রেতা কমিশন | ৪৫ টাকা | ৭৫ টাকা | ৬৬.৬% |
| সিলিন্ডার সংকট সমাধান | ৫.৫ কোটি সিলিন্ডারের মধ্যে সচল মাত্র ১.২৫ কোটি। | সকল সিলিন্ডার রিফিল নিশ্চিত করা। | – |
| প্রশাসনিক ব্যবস্থা | ভোক্তা অধিকারের অভিযান ও জরিমানা বন্ধ। | হয়রানিমুক্ত ব্যবসার পরিবেশ নিশ্চিত করা। | – |
| মূল্য নির্ধারণ | বিইআরসি কর্তৃক একতরফা মূল্য নির্ধারণ বন্ধ। | ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনা করে দাম সমন্বয়। | – |
সিলিন্ডার সংকট ও ব্যবসায়ীদের যুক্তি
সংগঠনটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, দেশে বর্তমানে এলপিজির কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। বাজারে প্রায় ২৭টি কোম্পানির সাড়ে পাঁচ কোটি সিলিন্ডার রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় চার কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডারই রিফিল না হওয়ায় খালি পড়ে আছে। এতে পরিবেশকদের বিনিয়োগ আটকে গেছে এবং তারা দেউলিয়া হওয়ার পথে। ব্যবসায়ীদের মতে, বিইআরসি পরিবেশকদের বাস্তব খরচ বিবেচনা না করেই মূল্য নির্ধারণ করছে, যা লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান ও জরিমানাকে তারা ‘আতঙ্ক সৃষ্টি’ ও ‘হয়রানি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সরকার ও বিইআরসির অবস্থান
অন্যদিকে, বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ আইনি জটিলতার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, পরিবেশকরা তাদের সরাসরি লাইসেন্সধারী না হওয়ায় তাদের দাবি সরাসরি আমলে নেওয়ার সুযোগ কম। আমদানিকারকরা প্রস্তাব করলে গণশুনানির মাধ্যমে বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এদিকে জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, দেশে এলপিজির কোনো ঘাটতি নেই। বাজারে যে সংকট দেখা যাচ্ছে, তা মূলত ব্যবসায়িক কারসাজি। বাজার নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভোক্তা পর্যায়ে প্রভাব
জ্বালানি উপদেষ্টার কঠোর অবস্থানের বিপরীতে ব্যবসায়ীদের এই ধর্মঘট সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাসের সংযোগ নেই, সেখানে এলপিজিই একমাত্র ভরসা। ধর্মঘট দীর্ঘস্থায়ী হলে কালোবাজারে সিলিন্ডারের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মন্তব্য