উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি: বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকা ও তৎসংলগ্ন জেলাগুলোতে বন্যা পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি হচ্ছে। পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির ফলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিন এই পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। ভারতের মেঘালয় ও আসামের পাহাড়ি অঞ্চলে ভারী বর্ষণ এবং দেশের অভ্যন্তরে অতিবৃষ্টির প্রভাবে নদ-নদীর পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে।


নদ-নদীর বর্তমান গতিপ্রকৃতি ও বিপৎসীমা পর্যবেক্ষণ

পাউবো’র বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী মোস্তফা কামাল জিহান বর্তমানে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদ-নদীর একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেছেন। তার তথ্যমতে, এই অঞ্চলের একাধিক প্রধান নদীর পানি প্রাক-মৌসুমি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। বর্তমান পরিস্থিতির বিস্তারিত নিম্নরূপ:

  • সুনামগঞ্জ জেলা: জেলার জগন্নাথপুর পয়েন্টে নলজুর নদী প্রাক-মৌসুমি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

  • নেত্রকোনা জেলা: ভুগাই-কংস নদী জারিয়াজাঞ্জাইল পয়েন্টে এবং সোমেশ্বরী নদী কমলাকান্দা পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। এ ছাড়া নেত্রকোনা ও আটপাড়া পয়েন্টে মগরা নদীর পানিও বিপৎসীমার ওপরে অবস্থান করছে।

  • হবিগঞ্জ জেলা: জেলার সুতাং-রেলওয়ে ব্রিজ পয়েন্টে সুতাং নদী প্রাক-মৌসুমি বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে।

  • সিলেট জেলা: সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানির সমতল গত ২৪ ঘণ্টায় কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও তা অত্যন্ত বিপজ্জনক উচ্চতায় অবস্থান করছে।

অন্যদিকে, নেত্রকোনার ভুলাই-কংস নদীর পানির স্তর সামান্য কমলেও ধনু ও বাউলাই নদীসহ অন্যান্য হাওর অঞ্চলের নদ-নদীর পানির উচ্চতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।


বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস ও উজানের প্রভাব

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাগুলোর গাণিতিক মডেল অনুযায়ী, আগামী তিন দিন উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মাঝারি থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ভারতের মেঘালয় ও আসামের উজানে মাঝারি থেকে ভারী এবং দেশের অভ্যন্তরে হাওর অববাহিকায় ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ রেকর্ড করা হয়েছে।

এই মেঘালয় ও আসামের পাহাড়ি ঢল সরাসরি সুরমা ও কুশিয়ারা অববাহিকায় নেমে আসার ফলে আগামী ৭২ ঘণ্টায় এই নদীগুলোর পানির সমতল আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জের হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলগুলোতে নতুন করে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।


জেলাভিত্তিক ঝুঁকি ও আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার পূর্বাভাস

পাউবো’র তথ্য বিশ্লেষণ করে আগামী কয়েক দিনের জন্য জেলাভিত্তিক ঝুঁকির তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে:

১. সিলেট ও সুনামগঞ্জ: কুশিয়ারা নদীর পানির উচ্চতা আগামী তিন দিনে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়ে প্রাক-মৌসুমি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে জেলা দুটির নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

২. নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ: ধনু ও বাউলাই নদীর পানির সমতল আগামী তিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকবে। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বাউলাই নদী খালিয়াজুড়ি পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রম করার পূর্বাভাস রয়েছে। এর ফলে নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের বাউলাই অববাহিকার নিম্নাঞ্চলগুলো দ্রুত প্লাবিত হতে পারে। তবে ভুগাই-কংস ও সোমেশ্বরী নদীর পানি স্থিতিশীল থাকলেও নিম্নাঞ্চলের বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকবে।

৩. হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার: হবিগঞ্জের খোয়াই ও সুতাং এবং মৌলভীবাজারের মনু ও জুড়ি নদীর পানির উচ্চতা আগামী তিন দিন বাড়তে পারে। বিশেষ করে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খোয়াই ও জুড়ি নদী দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমা অতিক্রম করার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। মনু নদীও তার সতর্কসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে, যার ফলে মৌলভীবাজারে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।


কৃষি ও স্থানীয় জনপদের ওপর প্রভাব

এই প্রাক-মৌসুমি বন্যা হাওর অঞ্চলের বোরো ধান চাষিদের জন্য চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অনেক এলাকায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ফলে কাঁচা ও আধাপাকা ধান তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পাউবো নিয়মিতভাবে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে নদ-নদীর তথ্য সরবরাহ করছে যাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন যে, হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে এবং গবাদিপশু ও খাদ্যশস্য নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রাখতে হবে। নদীর তীরবর্তী প্রতিরক্ষা বাঁধগুলো নজরদারিতে রাখা এবং কোনো ছিদ্র বা ফাটল দেখা দিলে তাৎক্ষণিক কর্তৃপক্ষকে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উজানে বৃষ্টিপাতের তীব্রতা না কমলে এই বন্যা পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।