রাজধানীর মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে গ্রাহক ফোরাম ও চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পৃথক অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে দিলকুশায় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় এবং শাপলা চত্বর এলাকায় নিজ নিজ দাবিতে অবস্থান নেন দুই পক্ষের আন্দোলনকারীরা।
দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে সচেতন গ্রাহক ফোরামের নেতাকর্মীরা অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। এ সময় তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং ব্যাংকের আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। বিশেষ করে এস আলম গ্রুপসহ ব্যাংকের অর্থ লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি তুলে ধরেন তারা।
ফোরামের নেতারা জানান, প্রধান কার্যালয়ের সামনে তাদের অবস্থান কর্মসূচি টানা পাঁচ দিন ধরে চলছে। ব্যাংকের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবিতে তারা এ কর্মসূচি পালন করছেন।
অন্যদিকে, শাপলা চত্বর এলাকায় পৃথক কর্মসূচি পালন করেন ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ‘দফা এক, দাবি এক—চাকরি ফেরত চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন তারা। আন্দোলনকারীদের দাবি, চট্টগ্রামের পটিয়া থেকেও শতাধিক চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন।
চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, গত রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে তারা স্মারকলিপি দিয়েছেন। তবে স্মারকলিপি দেওয়ার পরও এখন পর্যন্ত গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পাননি। তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা না হলে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাওসহ আরও কঠোর কর্মসূচি নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।
সচেতন গ্রাহক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক নুরুন্নবী মানিক বলেন, ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ গঠনের প্রক্রিয়া যখন শেষ পর্যায়ে, তখন ব্যাংককে অস্থিতিশীল করার নানা চেষ্টা চলছে। তার দাবি, এর অংশ হিসেবে একটি চক্র ব্যাংকের সামনে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংককে অস্থিতিশীল করার যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে গ্রাহকেরা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন। গ্রাহকদের স্বার্থে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখার কথাও জানান তিনি।
ফোরামের সচিব মুতাসিম বিল্লাহ বলেন, ব্যাংকের স্থিতিশীলতা ফেরাতে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে এস আলম গ্রুপের বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ থাকা সম্পদ উদ্ধার, অবৈধ ঋণ সুবিধা সমন্বয় এবং সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
চাকরিচ্যুতদের পুনর্বহালের দাবির বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছেন মুতাসিম বিল্লাহ। তিনি বলেন, এস আলমের সময়ে অনেককে যথাযথ নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরে তাদের চাকরিতে রাখার সুযোগ তৈরি করতে পরীক্ষা নেওয়া হয়। ওই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া অনেকেই বর্তমানে ব্যাংকে কর্মরত রয়েছেন। তবে বর্তমান আন্দোলনকারীদের অনেকে সেই পরীক্ষায় অংশ নেননি বলে দাবি করেন তিনি।
তবে মুতাসিম বিল্লাহর এই বক্তব্য অস্বীকার করেছেন চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা মিজান। তার ভাষ্য, পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কারণে অনেকেই ওই পরীক্ষায় অংশ নেননি। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সবাই চাকরিতে বহাল রয়েছেন—এ দাবিও সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। চাকরি ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন মিজান।
চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা আনোয়ার বলেন, কোনো নোটিশ বা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই তাদের চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বেকার থাকায় পরিবার নিয়ে তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। চাকরিতে পুনর্বহালের পাশাপাশি প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়ারও দাবি জানান আনোয়ার।
অন্য আন্দোলনকারী আশরাফ বলেন, চাকরি হারানোর পর পরিবার নিয়ে তারা কঠিন আর্থিক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন। চাকরি ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।
এদিকে, গ্রাহক ফোরামের পক্ষ থেকে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ঋণ বিতরণ ও বিভিন্ন অনিয়মে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আন্দোলনরত চাকরিচ্যুতদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
একই ব্যাংককে ঘিরে দুই পক্ষের আলাদা কর্মসূচিতে তাদের দাবির পার্থক্যও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গ্রাহক ফোরাম ব্যাংকের স্থিতিশীলতা, পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং কথিত আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চাচ্ছে। অন্যদিকে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের চাকরি ফিরে পাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার সুযোগ দাবি করছেন। মতিঝিলে দুই পক্ষের কর্মসূচি অব্যাহত থাকায় ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে বিরোধের বিষয়টি আরও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে।








