ইরানে সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়া নাগরিকদের উদ্দেশে তিন দিনের আল্টিমেটাম জারি করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণ করলে শাস্তির ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখানো হবে—এমন আশ্বাস দিয়েছে ইরানের জাতীয় পুলিশ। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, যারা ‘প্রতারিত হয়ে’ দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়েছেন, তাদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শত্রু হিসেবে নয়, বরং বিভ্রান্ত নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
ইরানের জাতীয় পুলিশের প্রধান আহমাদ-রেজা রাদান এক বক্তব্যে বলেন, তরুণদের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বহিরাগত উসকানিতে প্ররোচিত হয়ে সহিংসতায় জড়িয়েছে। তারা যদি আত্মসমালোচনা করে রাষ্ট্রের কাছে ফিরে আসে, তাহলে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের আইনি কাঠামোর মধ্যেই তাদের প্রতি সহনশীল আচরণ করা হবে। এই উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ তিন দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত বছরের ডিসেম্বরের শেষদিকে দেশটিতে অর্থনৈতিক সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও বেকারত্বের ক্ষোভ থেকে যে বিক্ষোভ শুরু হয়, তা দ্রুতই দেশজুড়ে বিস্তৃত হয়। প্রথম দিকে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, সরকারি ভবন ও নিরাপত্তা স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে। টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই আন্দোলনকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ইরানি নেতৃত্বের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সরকারের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলসহ বৈদেশিক শক্তির মদদে এসব বিক্ষোভ ‘দাঙ্গায়’ রূপ নেয় এবং এর লক্ষ্য ছিল ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে অস্থিতিশীল করা। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, কঠোর দমন-পীড়নের ফলে বর্তমানে বিক্ষোভ অনেকটাই স্তিমিত হলেও পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সহিংসতা ও সংঘর্ষে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে—যা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনা চলছে। রাষ্ট্রায়ত্ত তাসনিম নিউজ জানায়, গত সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, প্রকৃত গ্রেপ্তারসংখ্যা ২০ হাজারের কাছাকাছি হতে পারে।
এর আগে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এক ভাষণে নিরাপত্তা বাহিনীকে কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘ফিতনাবাজদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে হবে’ এবং দেশি-বিদেশি অপরাধীরা কোনোভাবেই শাস্তি এড়াতে পারবে না। এই বক্তব্যের পরই আত্মসমর্পণের আল্টিমেটামকে সরকার কঠোরতা ও নমনীয়তার সমন্বিত কৌশল হিসেবে তুলে ধরছে।
ইরানের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ: সংক্ষিপ্ত চিত্র
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| বিক্ষোভ শুরুর সময় | ডিসেম্বরের শেষভাগ |
| প্রধান কারণ | অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক অসন্তোষ |
| সরকার নির্ধারিত আত্মসমর্পণের সময় | ৩ দিন |
| সরকারি হিসাবে নিহত | প্রায় ৫,০০০ |
| সরকারি হিসাবে গ্রেপ্তার | প্রায় ৩,০০০ |
| মানবাধিকার সংস্থার দাবি | গ্রেপ্তার ২০,০০০ পর্যন্ত |
পর্যবেক্ষকদের মতে, আত্মসমর্পণের এই আল্টিমেটাম ইরান সরকারের জন্য একদিকে আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চাপ সামাল দেওয়ার কৌশল। তবে বাস্তবে কতজন এতে সাড়া দেবে এবং পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে—তা সময়ই বলে দেবে।
