ইরানে জরুরি সহায়তায় চীনের ঘোষণা

মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের জনগণের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে চীন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় দুই লাখ মার্কিন ডলারের জরুরি মানবিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেইজিং। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, মানবিক বিবেচনায় এই সহায়তা প্রদান করা হবে এবং তা ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মাধ্যমে নিহতদের পরিবার ও ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

শুক্রবার (১৩ মার্চ) এক প্রেস ব্রিফিংয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুয়ো জিয়াকুন বলেন, বেসামরিক মানুষ ও স্থাপনার ওপর হামলার ঘটনায় বেইজিং গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। তিনি বলেন, “স্কুলের মতো বেসামরিক স্থাপনায় হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং মানবতার মৌলিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।”

চীনের রেড ক্রস সোসাইটি এই সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, জরুরি ত্রাণ সহায়তার মাধ্যমে নিহতদের পরিবার এবং আহতদের চিকিৎসা সহায়তায় অংশ নেওয়া হবে। পাশাপাশি মানবিক সংকট মোকাবিলায় ভবিষ্যতেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বেইজিং।

এই সহায়তার ঘোষণার পেছনে রয়েছে দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরে সংঘটিত ভয়াবহ এক হামলার ঘটনা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাবের শাজারাহ তায়্যিবাহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় অন্তত ১৫০ জন স্কুলছাত্রী নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ঘটনার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে।

পরিস্থিতি দ্রুতই একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেয়। ইরান সরকার দাবি করেছে, সাম্প্রতিক এই সামরিক অভিযানে দেশজুড়ে ১ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন প্রায় ১০ হাজারের বেশি মানুষ। নিহতদের মধ্যে দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও রয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

সংঘাতের জবাবে ইরানও পাল্টা পদক্ষেপ নেয়। তেহরান ইসরায়েল, জর্ডান, ইরাক এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত আটজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।

এদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। মার্চের শুরু থেকেই ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন সীমিত করে দেয়। এই জলপথ বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে পরিচিত।

নিচের টেবিলে সাম্প্রতিক সংঘাতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হলো—

বিষয়তথ্য
সংঘাতের সূচনা২৮ ফেব্রুয়ারি, মিনাবের স্কুলে হামলার পর
মিনাব স্কুল হামলায় নিহতপ্রায় ১৫০ জন স্কুলছাত্রী
ইরানে মোট নিহত১,৩০০ জনের বেশি
মোট আহত১০,০০০ জনের বেশি
মার্কিন সেনা নিহতঅন্তত ৮ জন
চীনের মানবিক সহায়তা২ লাখ মার্কিন ডলার
তেল পরিবহন রুটহরমুজ প্রণালি

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এছাড়া বিশ্বের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশও এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই রুটে যেকোনো ধরনের বাধা বিশ্ববাজারে তেলের দাম এবং জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

চীন এ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। গুয়ো জিয়াকুন বলেন, “সব দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করা জরুরি। সংঘাত সমাধানের একমাত্র পথ হলো সংলাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগ।”

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এই মানবিক সহায়তার ঘোষণা কেবল একটি ত্রাণ সহায়তা নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে কূটনৈতিক বার্তাও বহন করছে। বেইজিং একদিকে মানবিক সহায়তার মাধ্যমে ইরানের জনগণের পাশে দাঁড়াচ্ছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সংলাপের ওপর গুরুত্ব আরোপ করছে।