স্মরণে শব্দসৈনিক সুজেয় শ্যাম

বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে এক অনন্য ও উজ্জ্বল নাম সুজেয় শ্যাম। তিনি ছিলেন একাধারে বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক এবং চলচ্চিত্রের খ্যাতিমান সুরকার। সংগীত, দেশপ্রেম ও সৃজনশীলতার অপূর্ব সমন্বয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক সমৃদ্ধ সংগীতজগৎ, যা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে স্থায়ী স্থান করে নিয়েছে।

১৯৪৬ সালের ১৪ মার্চ সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন এই গুণী শিল্পী। শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশে সংগীতচর্চার সুযোগ তাঁকে শিল্পীজীবনের দিকে এগিয়ে দেয়। কণ্ঠ, সুর ও সংগীত রচনায় তাঁর স্বতন্ত্র প্রতিভা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সংগীতমহলে তাঁকে পরিচিত করে তোলে।

১৯৬৯ সালে তিনি চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনার মাধ্যমে পেশাদার জীবনের একটি নতুন অধ্যায় শুরু করেন। সংগীত পরিচালক রাজা হোসেনের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন। তাঁদের এই জুটি “রাজা-শ্যাম” নামে চলচ্চিত্র অঙ্গনে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। সত্তর ও আশির দশকে এই জুটি প্রায় পঁচিশটি চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেন। তাঁদের সুরে নির্মিত গানগুলো দর্শক-শ্রোতার মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

নিচের সারণিতে তাঁদের যৌথভাবে সংগীত পরিচালিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র তুলে ধরা হলো—

চলচ্চিত্রের নামসময়কালউল্লেখযোগ্য দিক
সূর্যগ্রহণসত্তরের দশকসংগীত পরিচালনার জন্য বাচসাস পুরস্কার অর্জন
সূর্য সংগ্রামসত্তরের দশকদেশাত্মবোধক আবহের সংগীত
ভুল যখন ভাঙলআশির দশকজনপ্রিয় চলচ্চিত্র সংগীত

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সুজেয় শ্যাম ঐতিহাসিক স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হন। সেখানে তিনি সংগীতসৈনিক হিসেবে কাজ করেন। সেই সময় মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করতে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা জাগিয়ে তুলতে অসংখ্য প্রেরণাদায়ী গান বেতারের মাধ্যমে প্রচারিত হয়। এই সংগীতধারা মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক শক্তিকে দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেছিল।

১৯৮৬ সালে আব্দুল লতিফ বাচ্চু পরিচালিত “বলবান” চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি এককভাবে সংগীত পরিচালনা শুরু করেন। এরপর ধারাবাহিকভাবে বহু চলচ্চিত্রে সুরারোপ করে তিনি নিজের স্বতন্ত্র সংগীতধারা প্রতিষ্ঠা করেন।

একুশ শতকের শুরুতে বাউল সাধক হাসন রাজাকে কেন্দ্র করে নির্মিত “হাছন রাজা” চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করে তিনি বিশেষভাবে প্রশংসিত হন। এই চলচ্চিত্রের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। চলচ্চিত্রটির একটি গানে পরিচালক চাষী নজরুল ইসলামের বিশেষ অনুরোধে তিনি নিজেই কণ্ঠ দেন, যা শ্রোতাদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়।

মুক্তিযুদ্ধের সংগীত ঐতিহ্য সংরক্ষণেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। ২০০৬ সালে তিনি “স্বাধীন বাংলা বেতারের গান” শিরোনামে একটি অ্যালবামের সংগীত পরিচালনা করেন। এতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ বেতার থেকে প্রচারিত ৪৬টি গান সংকলিত হয়। এই উদ্যোগ নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সংগীতভাণ্ডার পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক “একাত্তরের ক্ষুদিরাম” এবং “একাত্তরের মা জননী” চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেও তিনি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন। তাঁর সুরে দেশপ্রেম, লোকজ ধারা এবং আধুনিক সংগীতের এক অনন্য মেলবন্ধন দেখা যায়।

সংগীত ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্মাননা একুশে পদক, শিল্পকলা পদকসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারেও তিনি একাধিকবার সম্মানিত হন।

২০২৪ সালের ১৮ অক্টোবর প্রভাতে এই কিংবদন্তি শিল্পী পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। তবে তাঁর সুর, তাঁর দেশপ্রেম এবং তাঁর সৃষ্টি করা সংগীত বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ভাণ্ডারে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শব্দসৈনিক সুজেয় শ্যামের স্মৃতি ও সৃষ্টির প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা এবং বিনম্র প্রণাম।