জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

ইমামের চোট নিয়ে তদন্তে যাচ্ছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লর্ডস টেস্টে মাঠে থাকলেও ব্যাট হাতে নামতে পারেননি পাকিস্তানের বাঁহাতি ওপেনার ইমাম-উল-হক। বাঁ পায়ের পেশিতে চোটের কথা জানানো হলেও ম্যাচের চতুর্থ দিনে তাঁকে দলের সঙ্গে অনুশীলন করতে দেখা যাওয়ায় তাঁর চোটের প্রকৃতি ও তীব্রতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি এবার আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের আওতায় আনার কথা জানিয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)।

পিসিবির হাই পারফরম্যান্স বিভাগের পরিচালক আকিব জাভেদ ইমামের চোটের ঘটনায় প্রকাশ্যেই অসন্তোষ জানিয়েছেন। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাবেক এই পেসার বলেন, ঘটনাটি তাঁকে ‘গভীরভাবে হতাশ’ করেছে। তাঁর মতে, একজন খেলোয়াড় চোটে পড়তেই পারেন, কিন্তু সেই চোটের কারণে পুরো টেস্টে দুই ইনিংসেই ব্যাটিং থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি যথেষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করে।

আকিব বলেন, অতীতে ক্রিকেটাররা গুরুতর চোট নিয়েও মাঠে নামার চেষ্টা করেছেন। তাই ইমামের ক্ষেত্রেও অন্তত ব্যাটিং করার চেষ্টা করা উচিত ছিল বলে মনে করেন তিনি।

“ইমামের চোট নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে এবং আমি গভীরভাবে হতাশ। অতীতে খেলোয়াড়রা চোট পেয়েও প্লাস্টার করে মাঠে নামার চেষ্টা করেছে। আমরা এ ঘটনায় ব্যবস্থা নেব। পেশিতে টান লাগার কারণে কীভাবে দুই ইনিংসেই ব্যাট করা থেকে পুরোপুরি ছিটকে যাওয়া সম্ভব? তার চেষ্টা করা উচিত ছিল, লড়াই করা উচিত ছিল। তাকে তদন্তের মুখোমুখি হতে হবে,” বলেন আকিব।

তবে ইমাম ইচ্ছাকৃতভাবে চোটের অজুহাত দেখিয়েছেন—এমন সরাসরি অভিযোগ করেননি তিনি। আকিব স্পষ্ট করেছেন, ইমাম সত্যিই চোট পেয়েছিলেন কি না কিংবা চোটের মাত্রা কতটা ছিল, সে বিষয়ে তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তাঁর আপত্তির মূল জায়গা হলো চোটের ধরন ও ম্যাচে ইমামের অনুপস্থিতির মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না।

ম্যাচের আগে চোট, পরে অনুশীলন

লর্ডস টেস্টের দ্বিতীয় দিনের খেলা শুরুর কয়েক মিনিট আগে ইমামের চোটের কথা জানায় পিসিবি। বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাঁ পায়ের পেশিতে চোট পেয়েছেন এই ওপেনার। ম্যাচের বাকি সময়ে তিনি খেলতে পারবেন কি না, তা চিকিৎসকদের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করবে বলেও জানানো হয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় টেস্টে আর ব্যাটিংয়ে নামেননি ইমাম। পাকিস্তানের দুই ইনিংসেই তাঁর জায়গায় অন্য ব্যাটারদের দায়িত্ব সামলাতে হয়। কিন্তু চতুর্থ দিনের সকালে দলের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তাঁকে অনুশীলনে দেখা যায়। এরপরই তাঁর চোটের প্রকৃত অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়।

ম্যাচে ধারাভাষ্য দেওয়ার সময় ইমামের অনুশীলনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ইংল্যান্ডের সাবেক পেসার স্টুয়ার্ট ব্রড। পরে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইমামের সমালোচনা করেন। ফলে বিষয়টি শুধু পাকিস্তান দলের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনেও তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

তবে তদন্তের ফল প্রকাশের আগে ইমামের চোটকে সাজানো বা ইচ্ছাকৃত বলে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। একজন খেলোয়াড় অনুশীলনে অংশ নিতে পারছেন মানেই যে তিনি ম্যাচের চাপ সামলে ব্যাটিংয়ের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত—এমন সিদ্ধান্তও চিকিৎসাগতভাবে সরাসরি টানা যায় না। তাই পিসিবির তদন্তে চিকিৎসা-সংক্রান্ত মূল্যায়ন, চোটের মাত্রা এবং ম্যাচ পরিস্থিতিতে খেলোয়াড়ের সক্ষমতার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

লর্ডসের পর পাকিস্তান দলে বড় রদবদল

লর্ডসে দ্বিতীয় টেস্টে বড় ব্যবধানে হারের পর পাকিস্তান দল ঘিরে অসন্তোষ আরও বেড়েছে। ইমামসহ সাত ক্রিকেটারকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। একই সময়ে প্রধান কোচ সরফরাজ আহমেদ এবং বোলিং কোচ উমর গুলকেও দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

দুই টেস্টে পাকিস্তানের পারফরম্যান্স নিয়েও আকিব জাভেদ সন্তুষ্ট নন। তাঁর মতে, দল শুধু ম্যাচ হারেনি; অনেক সময় প্রতিপক্ষের সঙ্গে কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতাও গড়ে তুলতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে দলের ভারসাম্য ও খেলোয়াড় নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

আকিবের মতে, দলে পেস বোলিং অলরাউন্ডার, দ্বিতীয় উইকেটকিপার এবং তরুণ ফাস্ট বোলার উবায়েদ শাহর মতো বিকল্প ছিল। কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী তাঁদের কাজে লাগানো হয়নি।

দল নির্বাচনের প্রসঙ্গে তিনি জানান, অধিনায়ক বাবর আজম ও কোচের সঙ্গে উবায়েদ শাহকে একাদশে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে তিনি আলোচনা করেছিলেন। তাঁর মতে, ঘণ্টায় প্রায় ১৪০ কিলোমিটার গতিতে বল করতে সক্ষম একজন পেসার পাকিস্তানের বোলিং আক্রমণে বাড়তি গতি ও বৈচিত্র্য আনতে পারতেন।

ব্যাটিং-বোলিং ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন

পাকিস্তানের টপ অর্ডারের গঠন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আকিব। তাঁর ভাষ্য, প্রথম সাত ব্যাটসম্যানের কেউ নিয়মিত বোলিং করেন না। ফলে দলে অন্তত একজন কার্যকর অলরাউন্ডার থাকা প্রয়োজন ছিল।

সালমান আলীর ফর্ম নিয়েও কথা বলেছেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাট হাতে প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারায় তাঁকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত আকিব বুঝতে পারছেন বলে জানান। একই সঙ্গে উইকেটকিপিংয়ের জায়গায় মোহাম্মদ রিজওয়ানের পরিবর্তে গাজি ঘোরিকে সুযোগ দেওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা যেত বলে মত দেন তিনি।

তাঁর বক্তব্যে মূলত একটি বিষয়ই স্পষ্ট—শুধু প্রতিভাবান ক্রিকেটার থাকলেই শক্তিশালী টেস্ট দল তৈরি হয় না। দলের ভারসাম্য, কন্ডিশন অনুযায়ী একাদশ নির্বাচন এবং খেলোয়াড়দের কাছ থেকে সর্বোচ্চ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক মানসিকতা পাওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

‘পুরো বিশ্ব আমাদের নিয়ে হাসছে’

পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ব্যর্থতা নিয়ে আকিবের ভাষা ছিল বেশ কঠোর। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দল যদি ধারাবাহিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সমালোচনা বাড়বে।

“কাউকে না কাউকে ব্যবস্থা নিতেই হতো। আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা পর্যন্ত করতে পারছি না বলে পুরো বিশ্ব আমাদের নিয়ে হাসছে,” বলেন তিনি।

দেশে ফেরত পাঠানো ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রেও এর মাধ্যমে একটি বার্তা দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করেন আকিব। তাঁর মতে, গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সফরে শুধু স্কোয়াডের সদস্য হওয়াই যথেষ্ট নয়; প্রত্যেক ক্রিকেটারের কাছ থেকে পারফরম্যান্স, দায়িত্ববোধ এবং লড়াই করার মানসিকতা প্রত্যাশিত।

কোচ ও নির্বাচকদের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা

পাকিস্তান ক্রিকেটের সাম্প্রতিক অস্থিরতায় খেলোয়াড়দের পাশাপাশি কোচিং ও নির্বাচনী কাঠামোও আলোচনায় এসেছে। গত কয়েক বছরে দলটির কোচিং স্টাফে একাধিক পরিবর্তন হয়েছে। জেসন গিলেস্পি ও গ্যারি কারস্টেনের মতো কোচও দায়িত্ব পালন করে বিদায় নিয়েছেন।

হাই পারফরম্যান্স বিভাগের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে নির্বাচক ও কোচের ভূমিকাতেও ছিলেন আকিব। মাত্র তিন মাস আগে সরফরাজ আহমেদকে প্রধান কোচ করার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল। কিন্তু ছয়টি টেস্টের পরই সরফরাজকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

দল পুনর্গঠনের পর মিসবাহ-উল-হকও নির্বাচক প্যানেল থেকে পদত্যাগ করেছেন। তবে আকিব জানিয়েছেন, তাঁর সরে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই।

তাঁর যুক্তি, দল নির্বাচনের সময় খেলোয়াড় বাছাই ও স্কোয়াড গঠনে কোচ এবং অধিনায়কের সঙ্গে আলোচনা হয়। কিন্তু সফরে যাওয়ার পর নির্দিষ্ট ম্যাচের একাদশ নির্ধারণে হাই পারফরম্যান্স বিভাগের কর্মকর্তাদের সরাসরি ভূমিকা থাকে না। ফলে মাঠের একাদশ ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের দায় সংশ্লিষ্ট কোচ ও অধিনায়কের ওপরই বর্তায়।

নতুন কোচ হেসনকে সহযোগিতার আশ্বাস

পাকিস্তানের নতুন টেস্ট কোচ মাইক হেসনের ওপর আস্থার কথাও জানিয়েছেন আকিব। সাদা বলের ক্রিকেটের পাশাপাশি টেস্ট দলের দায়িত্ব পাওয়া হেসনকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।

আকিবের মতে, একজন কোচ বা একজন অধিনায়ক একা একটি দলকে সাফল্যের পথে নিতে পারেন না। তাঁদের মধ্যে সমন্বয় এবং পারস্পরিক আস্থা জরুরি। এখন হেসন ও বাবর আজম কীভাবে একসঙ্গে কাজ করেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

তবে রাতারাতি বড় পরিবর্তনের প্রত্যাশা না রাখার পরামর্শও দিয়েছেন আকিব। একটি ম্যাচের ফল দিয়ে পুরো দলের উন্নতি বা ব্যর্থতা বিচার করা যায় না। তাঁর মতে, পাকিস্তান ক্রিকেটে প্রতিভার ঘাটতি নেই; বরং সেই প্রতিভাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো, সঠিক সমন্বয় তৈরি করা এবং মাঠে লড়াইয়ের মানসিকতা ফিরিয়ে আনাই বড় চ্যালেঞ্জ।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ টেস্ট শুরু হওয়ার আগে তাই পাকিস্তান ক্রিকেটে একাধিক বিষয় আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। একদিকে ইমাম-উল-হকের চোট নিয়ে তদন্তের অপেক্ষা, অন্যদিকে দল থেকে একাধিক ক্রিকেটার ও কোচকে সরিয়ে পুনর্গঠনের উদ্যোগ। সব মিলিয়ে ইংল্যান্ড সিরিজের শেষ ম্যাচটি পাকিস্তানের জন্য শুধু একটি টেস্ট নয়, বরং সাম্প্রতিক সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।

Tags :

মুরসালিন মাহমুদ তাইসিন | সাব-এডিটর । GLive24.com

সর্বশেষ খবর