লিওনেল মেসির পায়ের জাদুতে আবারও মুগ্ধ ফুটবলবিশ্ব। আর্জেন্টাইন মহাতারকার জোড়া গোলে আটলান্টা ইউনাইটেডকে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়েছে ইন্টার মায়ামি। শুধু জয় এনে দেওয়াই নয়, এই ম্যাচে নতুন এক ইতিহাসও গড়েছেন আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী তারকা। মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টানা তিন মৌসুমে অন্তত ১৫টি করে অ্যাসিস্ট করার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন তিনি।
আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে মেসি দুটি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থের একটি গোলেও অবদান রাখেন। তাঁর এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ম্যাচসেরার স্বীকৃতিও জোটে। চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত তাঁর গোলসংখ্যা ২৫, সঙ্গে রয়েছে ১৫টি অ্যাসিস্ট। গোল করা এবং সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রে তাঁর ধারাবাহিকতা আবারও প্রমাণ করেছে, মায়ামির আক্রমণভাগে তিনি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
ম্যাচের প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে আসে মেসির রেকর্ড গড়ার ঘটনা। ৪৫ মিনিটে হেরমান বেরতেরামের গোলে এগিয়ে যায় ইন্টার মায়ামি। গোলটির আগে আক্রমণ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মেসি। তাঁর অবদান ছিল সেকেন্ডারি অ্যাসিস্ট হিসেবে। অর্থাৎ, গোলের ঠিক আগের পাসটি না দিলেও গোলের সূচনা করা আক্রমণে তাঁর ভূমিকা ছিল। এই অবদানই তাঁকে এমএলএসে টানা তিন মৌসুমে অন্তত ১৫টি অ্যাসিস্টের অনন্য মাইলফলকে পৌঁছে দেয়।
বিরতির পর অবশ্য গোল করার দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেন মেসি। ম্যাচের ৫৬ মিনিটে প্রতিপক্ষের বক্সে একাধিক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে বল জালে পাঠান তিনি। তাঁর অসাধারণ বল নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং চাপের মধ্যে সঠিকভাবে শট নেওয়ার দক্ষতা গোলটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
এর মাত্র চার মিনিট পর আবারও গোল করেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে অপ্রস্তুত অবস্থায় পেয়ে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন তিনি। পরপর দুই গোল করে মায়ামির জয় নিশ্চিত করার পথে বড় ভূমিকা রাখেন মেসি। তাঁর ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের পাশাপাশি দলের আক্রমণাত্মক ফুটবলও ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেয়।
মেসির এই পারফরম্যান্স ব্যক্তিগত পুরস্কারের দৌড়েও তাঁকে এগিয়ে দিয়েছে। এমএলএস গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে ২৫ গোল নিয়ে তিনি শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। এই পুরস্কার দেওয়া হয় লিগের নিয়মিত মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলদাতাকে। একই সঙ্গে ল্যান্ডন ডনোভান এমএলএস এমভিপি পুরস্কারেও টানা তৃতীয়বার জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তাঁর সামনে। এমন কৃতিত্ব অর্জন করতে পারলে লিগের ব্যক্তিগত পুরস্কারের ইতিহাসে আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় যোগ হবে।
দলীয় সাফল্যের দিক থেকেও আটলান্টার বিপক্ষে জয়টি মায়ামির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই জয়ে টানা তিন ম্যাচে জয় পেল দলটি। ওই তিন ম্যাচে তারা মোট নয়টি গোল করেছে, বিপরীতে হজম করেছে মাত্র একটি। আক্রমণভাগের কার্যকারিতা এবং রক্ষণভাগের দৃঢ়তা—দুই ক্ষেত্রেই সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোতে ইতিবাচক চিত্র দেখা যাচ্ছে।
গত মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন মায়ামি এরই মধ্যে প্লে-অফে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করেছে। আটলান্টাকে হারানোর পর ইস্টার্ন কনফারেন্সে ৫৫ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থান আরও মজবুত করেছে তারা। এই অবস্থান ধরে রাখতে পারলে প্লে-অফের প্রথম রাউন্ডে ঘরের মাঠে খেলার সুবিধা পাবে দলটি। নকআউট পর্বে নিজেদের দর্শকদের সামনে খেলার সুযোগ বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাতে পারে।
মায়ামির সামনে এখন আরও বড় লক্ষ্য। ২০১১ ও ২০১২ সালে টানা দুই মৌসুমে এমএলএস কাপ জিতেছিল লস অ্যাঞ্জেলেস গ্যালাক্সি। সেই কীর্তির পুনরাবৃত্তি করে টানা দ্বিতীয়বার লিগ শিরোপা জিততে চায় মায়ামি। তবে নিয়মিত মৌসুমে ভালো পারফরম্যান্স করলেই শিরোপা নিশ্চিত হয় না। প্লে-অফের প্রতিটি ম্যাচে দলকে কঠিন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হবে, যেখানে সামান্য ভুলও বড় মূল্য দিতে বাধ্য করতে পারে।
মেসির বর্তমান ছন্দ অবশ্য মায়ামির সমর্থকদের আশাবাদী করে তুলছে। তিনি শুধু নিজে গোল করছেন না, সতীর্থদের জন্যও সুযোগ তৈরি করছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিচ্ছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে দলটির জন্য বড় শক্তি হতে পারে।
আটলান্টার বিপক্ষে এই জয় তাই কেবল তিন পয়েন্ট অর্জনের ঘটনা নয়; এটি মেসির ব্যক্তিগত ইতিহাস গড়া এবং মায়ামির শিরোপার স্বপ্নকে আরও শক্তিশালী করারও উপলক্ষ। এখন দেখার বিষয়, নিয়মিত মৌসুমের এই ছন্দ ধরে রেখে প্লে-অফেও একই রকম প্রভাব বিস্তার করতে পারেন কি না আর্জেন্টাইন মহাতারকা।









