ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলায় একটি ওয়ার্কশপে কেমিক্যালবাহী ড্রাম কাটার সময় আকস্মিক বিস্ফোরণে মো. রায়হান (১২) নামে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় ওয়ার্কশপের মালিক লোকনাথ দাস (২৪) গুরুতর আহত হয়েছেন। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) দুপুরে আশুগঞ্জ উপজেলার লালপুর বাজারে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। অবহেলাজনিত এই মৃত্যু এবং ওয়ার্কশপের অনিরাপদ কাজের পরিবেশ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
Table of Contents
ঘটনার বিবরণ ও মৃত্যুর কারণ
নিহত রায়হান নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার চাঁনপুর গ্রামের আকবর হোসেনের ছেলে। সে জীবিকার তাগিদে স্থানীয় একটি ওয়ার্কশপে কাজ করত। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার দুপুরে লালপুর বাজারের একটি ওয়ার্কশপের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল রায়হান। ওই সময় ওয়ার্কশপ মালিক লোকনাথ দাস একটি ব্যবহৃত কেমিক্যাল ড্রাম মেশিন দিয়ে কাটার চেষ্টা করছিলেন।
ড্রামটির মুখ বা ছিপি দীর্ঘকাল বন্ধ থাকায় এর অভ্যন্তরে উচ্চমাত্রার দাহ্য গ্যাস জমা হয়েছিল। ড্রামটি কাটার সময় আগুনের স্ফুলিঙ্গ বা ঘর্ষণের ফলে ভেতরে থাকা গ্যাস প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের তীব্রতায় ড্রামের একটি ভারী ধাতব অংশ ছিটকে এসে সরাসরি রায়হানের মাথায় আঘাত করে। এতে তার মাথা মারাত্মকভাবে থেঁতলে যায় এবং সে ঘটনাস্থলেই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে। স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেও পথেই তার মৃত্যু হয়।
এক নজরে দুর্ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| নিহতের নাম | মো. রায়হান (১২) |
| পিতার নাম | আকবর হোসেন (রায়পুরা, নরসিংদী) |
| দুর্ঘটনার স্থান | লালপুর বাজার, আশুগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া |
| দুর্ঘটনার কারণ | কেমিক্যাল ড্রাম বিস্ফোরণ |
| আহত ব্যক্তি | লোকনাথ দাস (২৪), ওয়ার্কশপ মালিক |
| আইনি অবস্থা | লাশ মর্গে প্রেরিত, পুলিশের তদন্ত চলমান |
ওয়ার্কশপে নিরাপত্তার অভাব ও বিশেষজ্ঞ মত
শিল্পাঞ্চল বা লোকালয়ের ওয়ার্কশপগুলোতে ড্রাম কাটার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সুরক্ষা নীতিমালা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা মানা হয় না। বিশেষজ্ঞরা জানান, কেমিক্যালবাহী বা দাহ্য পদার্থের ড্রাম কাটার আগে সেটির মুখ খুলে বাতাস বের করে দেওয়া এবং ভেতরে পানি বা নিষ্ক্রিয় গ্যাস দিয়ে পূর্ণ করা বাধ্যতামূলক। বদ্ধ অবস্থায় ড্রাম কাটলে তা কামানের গোলার মতো শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। আশুগঞ্জের এই ঘটনায় সেই প্রাথমিক নিরাপত্তা বিধিটি চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
পুলিশের বক্তব্য ও পরবর্তী পদক্ষেপ
আশুগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সফিউল আলম চৌধুরী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান যে, খবর পাওয়ার সাথে সাথেই পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে ময়নাতদন্তের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ওসি আরও জানান, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এটি একটি দুর্ঘটনা, তবে কেমিক্যাল ড্রাম কাটার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার অবহেলা ছিল কি না, তা আমরা খতিয়ে দেখছি। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
শিশু শ্রমের করুণ পরিণতি এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাব—এই দুটি বিষয়ই রায়হানের অকাল মৃত্যুর মাধ্যমে পুনরায় সামনে এসেছে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, লোকালয়ের ভেতরে ঝুঁকিপূর্ণ এসব ওয়ার্কশপ পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রশাসনের কঠোর তদারকি প্রয়োজন, যেন ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন স্বজন হারানোর বেদনায় নীল হতে না হয়।
