ইরানের রাজপথে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের আগুন এখন দ্বিতীয় সপ্তাহে পদার্পণ করেছে, যা দেশটির বর্তমান শাসনব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী হওয়ার প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন কেবল রুটি-রুজির লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে রূপ নিয়েছে। গত রোববার নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অবস্থান এবং বিক্ষোভকারীদের প্রতিরোধের ফলে পরিস্থিতি চরম সহিংস হয়ে ওঠে। নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, দেশজুড়ে চলমান এই বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৩০ জনেরও বেশি মানুষ। এই অস্থিরতার জেরে প্রশাসন এখন পর্যন্ত ৫৮২ জনকে কারারুদ্ধ করেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই স্পষ্ট করে তোলে।
গত ডিসেম্বরের শেষদিকে তেহরানের বাজারগুলোতে ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট দিয়ে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা এখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে ইরানের সীমান্ত এলাকাগুলোতে। বিশেষ করে কুর্দি ও লোর জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে আন্দোলনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। বিক্ষোভকারীরা সরাসরি ধর্মীয় নেতৃত্বের সমালোচনা করে স্লোগান দিচ্ছেন, যা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দীর্ঘ শাসনামলে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। যদিও ২০২২ সালের হিজাববিরোধী আন্দোলনের তুলনায় এই বিক্ষোভের ব্যাপ্তি এখনও কিছুটা সীমিত, তবে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এর জনসমর্থন দিন দিন বাড়ছে। ইসরায়েলের সাথে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা এবং পারমাণবিক অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির পর এমন অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ইরান সরকারকে দ্বিমুখী চাপের মুখে ফেলেছে।
নিচে ইরানের চলমান সংকটের বিভিন্ন দিক ও বর্তমান তথ্যাবলি একটি ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
ইরান বিক্ষোভের ব্যাপ্তি ও ক্ষয়ক্ষতির চালচিত্র
| সূচক | বিস্তারিত বিবরণ |
| আন্দোলনের ব্যাপ্তি | ইরানের ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ২৩টি প্রদেশ |
| আক্রান্ত শহরের সংখ্যা | প্রায় ৪০টি শহর ও জনপদ |
| মোট প্রাণহানি | ১২ জন (নিরাপত্তা রক্ষীসহ) |
| মোট গ্রেপ্তার | ৫৮২ জন (এখন পর্যন্ত নিশ্চিত) |
| প্রস্তাবিত সরকারি ভাতা | জনপ্রতি মাসিক ৭ ডলার (প্রায় ৮৫৪ টাকা) |
| আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল | তেহরান, শিরাজ এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশসমূহ |
| প্রধান চালিকাশক্তি | আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি ও রাজনৈতিক অসন্তোষ |
বিক্ষোভ প্রশমিত করতে ইরান সরকার স্বল্পমেয়াদী কিছু আর্থিক প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছে। সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকদের আগামী চার মাস সামান্য কিছু অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, মুদ্রাস্ফীতির তুলনায় এই সামান্য ভাতা জনগণের ক্ষোভ নিভিয়ে দিতে সক্ষম হবে না। এদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে উত্তেজনা বাড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত থাকলে এবং অতীতের মতো নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চললে ওয়াশিংটন ‘কঠোর প্রতিক্রিয়া’ দেখাবে। এএফপির হিসাব মতে, ছোট ও মাঝারি আকারের শহরগুলো বর্তমানে এই আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে, যেখানে নিয়ন্ত্রণের চেয়ে দমনমূলক ব্যবস্থার খবরই বেশি আসছে। ইরানের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা এখন নির্ভর করছে সরকার কীভাবে এই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষোভের মোকাবিলা করে তার ওপর।
