জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

আর্জেন্টিনায় চরম অর্থনৈতিক সংকট: খাবার কিনতেও নিতে হচ্ছে ঋণ

বিশ্বজয়ী ফুটবলার লিওনেল মেসির দেশ আর্জেন্টিনা বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি এবং ক্রয়ক্ষমতার চরম অবনতির কারণে দেশটির সাধারণ নাগরিকরা এখন আক্ষরিক অর্থেই টিকে থাকার লড়াই করছেন। অবস্থা এতটাই সঙ্গিন যে, দৈনন্দিন খাবার এবং জীবন রক্ষাকারী ওষুধের মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতেও মানুষকে এখন ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে অথবা ঘরের আসবাবপত্র বিক্রি করতে হচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতির এই করাল গ্রাসে পিষ্ট হয়ে আর্জেন্টিনার মধ্যবিত্ত সমাজও এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার শঙ্কায় দিনাতিপাত করছে।


অর্থনৈতিক সংকটের বর্তমান চিত্র

বুয়েনস আইরেসের গ্র্যান্ডে ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় উঠে এসেছে যে, আর্জেন্টিনার প্রায় অর্ধেক মানুষ এখন তাদের দীর্ঘদিনের জমানো সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাচ্ছেন। ৪৩ বছর বয়সি বিক্রেতা দিয়েগো নাকাশিও জানান, “মাসের ১৫ তারিখ আসার আগেই বেতন শেষ হয়ে যায়। বাকি দিনগুলোতে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে হয় ক্রেডিট কার্ডের ঋণে অথবা বাড়তি কোনো কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে।” এই পরিস্থিতি কেবল দিয়েগোর একার নয়, বরং দেশটির সিংহভাগ শ্রমজীবী মানুষের নিত্যদিনের গল্প।

আর্জেন্টিনার অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মূল সূচকসমূহ:

সূচক বা বিষয়বর্তমান অবস্থা ও পরিসংখ্যান
খাদ্যদ্রব্য ক্রয়পূর্বের তুলনায় ১২.৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
ব্যক্তিগত ঋণ খেলাপি১১ শতাংশ (২০১০ সালের পর সর্বোচ্চ রেকর্ড)।
সুপারমার্কেট কেনাকাটাপ্রায় ৫০ শতাংশই এখন ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মূল্যমুদ্রাস্ফীতির হারের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
সঞ্চয় পরিস্থিতি৫৪ শতাংশ মানুষ সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন খরচ মেটাচ্ছেন।

সরকারি নীতি ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ক্ষমতায় আসার পর প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই অর্থনীতিতে ভারসাম্য আনার লক্ষ্যে কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন নীতি গ্রহণ করেছেন। তিনি সরকারি ব্যয় ব্যাপকভাবে হ্রাস করার চেষ্টা করছেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৬ ও ২০২৭ সালের জন্য আর্জেন্টিনার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আশার বাণী শোনালেও, সাধারণ মানুষের জীবনে তার কোনো ইতিবাচক প্রতিফলন নেই। যদিও কৃষি ও ব্যাংকিং খাতে কিছুটা গতি দেখা যাচ্ছে, কিন্তু উৎপাদন ও খুচরা বিক্রয় খাতে চরম ধস নেমেছে। সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় না বাড়লেও নিত্যপণ্যের দাম পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।

বিপজ্জনক ঋণচক্র ও সামাজিক প্রভাব

আর্জেন্টিনার মানুষ এখন এক অন্তহীন ঋণচক্রের ফাঁদে আটকা পড়ছে। ব্যাংক থেকে ঋণ না পেয়ে অনেকেই এখন অনানুষ্ঠানিক বা চড়া সুদের মহাজনি ঋণের দ্বারস্থ হচ্ছেন। স্কুল শিক্ষক ভেরোনিকা মালফিতানোর মতো অনেকেই ব্যক্তিগত খরচ কমাতে দলগতভাবে পাইকারি বাজার থেকে পণ্য কিনছেন। ক্রেডিট কার্ডের পুরো বিল পরিশোধ করতে না পেরে মানুষ কেবল ‘ন্যূনতম পাওনা’ টুকু দিয়ে কার্ড সচল রাখছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সুদের বোঝা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ লুসিয়া ক্যাভালেরো এই পরিস্থিতিকে একটি মানবিক বিপর্যয় হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, কেবল কিস্তি সুবিধা বাড়িয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। যতক্ষণ না পর্যন্ত মানুষের মজুরি নিত্যপণ্যের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে, ততক্ষণ আর্জেন্টিনার সাধারণ মানুষের এই দুর্ভোগ কাটবে না। রাজনৈতিক দলগুলো ঋণের বোঝা কমাতে নতুন বিল আনার প্রস্তাব দিলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় না কমলে এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

একদা সমৃদ্ধিশালী এই দেশটিতে এখন মানুষ কেবল ফুটবল জয় নিয়ে পড়ে নেই, বরং আগামীকালের দুমুঠো অন্ন সংস্থান হবে কি না—সেই দুশ্চিন্তাই এখন সবার প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Tags :

Tanjim

Recent News