খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ই জুলাই ২০২৬, ৬:৫০ পিএম

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে নাটকীয় এক ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছে স্পেন। পুরো ম্যাচে আধিপত্য বিস্তার করে, একের পর এক আক্রমণ তৈরি করে এবং শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে ফেররান তরেসের গোলে জয় নিশ্চিত করে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল।
ফাইনালের স্কোরলাইন হয়তো ম্যাচের পুরো চিত্র তুলে ধরে না। কারণ ১২০ মিনিটের অধিকাংশ সময়েই আর্জেন্টিনা ছিল স্পেনের চাপের মধ্যে। লিওনেল স্কালোনির দল আক্রমণ গড়ে তুলতে হিমশিম খেয়েছে। বিশ্বকাপ ধরে রাখার স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামা বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা স্পেনের সংগঠিত রক্ষণ, নিখুঁত প্রেসিং এবং বল নিয়ন্ত্রণের কৌশলের সামনে কার্যত অসহায় হয়ে পড়ে।
স্পেনের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল লিওনেল মেসিকে কার্যকরভাবে আটকে রাখা। বিশ্বের অন্যতম সেরা এই ফুটবলারকে ঘিরে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ সাজানো হলেও, রদ্রি, দানি ওলমোসহ স্পেনের মাঝমাঠের খেলোয়াড়রা তাকে বল পাওয়ার সুযোগ খুব কমই দিয়েছেন। মেসি কয়েকটি মুহূর্তে নিজের স্বাভাবিক সৃজনশীলতার ঝলক দেখানোর চেষ্টা করলেও স্পেনের পরিকল্পিত রক্ষণভাগ তাকে স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে দেয়নি।
পরিসংখ্যানেও স্পেনের আধিপত্য স্পষ্ট। ম্যাচে প্রায় ৬৫ শতাংশ সময় বল দখলে রাখে তারা। গোলের উদ্দেশ্যে ২০টি শট নেয় স্পেন, যার মধ্যে ১২টি ছিল লক্ষ্যে। বিপরীতে আর্জেন্টিনা পুরো ম্যাচে মাত্র দুটি শট নিতে পারে, যার কোনোটিই গোলরক্ষককে বড় পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিল স্পেন। প্রথম পাঁচ মিনিটের মধ্যেই দুইবার আর্জেন্টিনার রক্ষণে চাপ তৈরি করে তারা। দানি ওলমোর পাস থেকে লামিন ইয়ামাল ভালো সুযোগ তৈরি করলেও তার কোনাকুনি শট দুর্দান্ত দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেস।
তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই পাল্টা আক্রমণে বড় সুযোগ পেতে পারত আর্জেন্টিনা। লম্বা বল ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন মেসি, কিন্তু দ্রুত এগিয়ে এসে ডি-বক্সের বাইরে থেকে বল ক্লিয়ার করে দেন স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমোন।
প্রথমার্ধের শেষদিকে স্পেনের মিকেল ওইয়ারসাবাল একটি ভালো সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু তার শট যথেষ্ট শক্তিশালী না হওয়ায় সহজেই তা নিয়ন্ত্রণ করেন মার্তিনেস। বিরতির আগে লিসান্দ্রো মার্তিনেস হলুদ কার্ড দেখেন এবং পরে কোচ তাকে তুলে নেন।
দ্বিতীয়ার্ধেও একই চিত্র দেখা যায়। স্পেন বল নিয়ন্ত্রণ করে আক্রমণের চেষ্টা চালিয়ে যায়, আর আর্জেন্টিনা মূলত রক্ষণ সামলাতেই ব্যস্ত থাকে। মাঠে উত্তেজনাও ছড়িয়ে পড়ে যখন বদলি খেলোয়াড় লেয়ান্দ্রো পারেদেস রদ্রিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেন। দুই দলের খেলোয়াড়রা জড়ো হয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি করেন। পরে দানি ওলমোকে ধাক্কা দেওয়ায় পারেদেস হলুদ কার্ড পান।
ম্যাচের নির্ধারিত সময় শেষের দিকে এগোলেও আর্জেন্টিনা গোলের জন্য কার্যকর কোনো আক্রমণ তৈরি করতে পারছিল না। ৯০ মিনিটের শেষ দিকে বড় ধাক্কা খায় তারা। মাঝমাঠে ফাউলের কারণে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন এন্সো ফের্নান্দেস। ফলে অতিরিক্ত সময়ে ১০ জন নিয়ে খেলতে হয় আর্জেন্টিনাকে।
এরপরও গোলের জন্য মরিয়া ছিল স্পেন। লামিন ইয়ামালের দুর্দান্ত ফ্রি-কিক অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন মার্তিনেস। পরে নিকো উইলিয়ামসের হেডও রুখে দেন তিনি।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্পেনের আক্রমণের চাপ সামলাতে পারেনি আর্জেন্টিনা। অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত গোল। পেদ্রো পররোর ক্রস থেকে নিকো উইলিয়ামস হেড করে বল নামিয়ে দেন, আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জোরালো শটে বল জালে পাঠান ফেররান তরেস। তার গোলে উল্লাসে মেতে ওঠে স্পেনের সমর্থকেরা।
শেষদিকে আর্জেন্টিনা মরিয়া হয়ে আক্রমণে ওঠে। মেসিও একটি অসাধারণ প্রচেষ্টা করেছিলেন। দূর থেকে তার বাঁকানো ক্রস পোস্ট ঘেঁষে বাইরে চলে যায়। কয়েকটি কর্নার পেলেও সমতা ফেরানোর মতো সুযোগ আর তৈরি করতে পারেনি তারা।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শুরু হয় স্পেনের উদ্যাপন। মাদ্রিদসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা স্প্যানিশ সমর্থকেরা বিশ্বজয়ের আনন্দে মেতে ওঠেন। অন্যদিকে শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন নিয়ে নামা আর্জেন্টিনা বিদায় নেয় হতাশা নিয়ে।
এটি ছিল স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়। এর আগে ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল তারা। এবার আরও একটি বড় অর্জন যোগ হলো তাদের ইতিহাসে। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করে সবচেয়ে কম গোল খেয়ে বিশ্বকাপ জয়ের নতুন নজিরও গড়েছে স্পেন।
অন্যদিকে, এই ম্যাচটি সম্ভবত লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ যাত্রার শেষ অধ্যায় হয়ে থাকল। দুইবারের গোল্ডেন বলজয়ী এই আর্জেন্টাইন অধিনায়ক টুর্নামেন্ট শেষ করেছেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আট গোল নিয়ে। শিরোপা দিয়ে বিশ্বকাপ অধ্যায় শেষ করার স্বপ্ন পূরণ না হলেও, ফুটবল ইতিহাসে তার অবদান ও অর্জন চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মন্তব্য