আজ ৩ ফেব্রুয়ারি, আরমান খানের জন্মদিন। কিন্তু রাজধানীর ঝলমলে মঞ্চে কেক কাটা বা নতুন গানের ঘোষণায় তাঁকে দেখা মেলে না বহুদিন। তবু ‘নান্টু ঘটক’ নামটি উচ্চারণ করলেই শ্রোতার মনে ভেসে ওঠে সেই চেনা লাইন—“পোলা তো নয় যেন আগুনের গোলা!” একসময়ের সুপারহিট গানের গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক আরমান খানের সৃষ্টি আজও শ্রোতাদের স্মৃতিতে সমান জীবন্ত।
প্রমিথিউস ব্যান্ডের বিপ্লবের কণ্ঠে ‘চান্দের বাতির কসম দিয়া’, আর্ক ব্যান্ডের হাসানের গাওয়া ‘শীত নয় গ্রীষ্ম নয় এসেছে বসন্ত’, ‘লাল বন্ধু নীল বন্ধু’—এসব গান আরমান খানের সুর ও সংগীতায়োজনের নিদর্শন। যদিও ‘ভাইরাল’ শব্দ তখন প্রচলিত ছিল না, তবে এই গানগুলো তখনকার সময়ের ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। হাটে-মাঠে, ঘাটে, বাসে বা চায়ের দোকানে—সবখানে বাজত তাঁর সুর।
আজও জন্মদিনে প্রশ্ন জাগে—একসময়ের ব্যস্ত সংগীতস্রষ্টা আরমান খান এখন কোথায়?
সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার
আজ মাত্র তিন দিনের ছুটিতে ঢাকায় এসেছেন তিনি। হোয়াটসঅ্যাপে সংক্ষিপ্ত আলাপ থেকে জানা যায়, “সংগীতাঙ্গনের বাইরে থাকলেও শহর, মানুষ ও পুরোনো দিনের স্মৃতির সঙ্গে আমার সংযোগ এখনও অটুট।” কালই আবার তিনি ফিরবেন কর্মস্থলে।
সংগীতজীবনের স্বর্ণযুগ
নব্বইয়ের দশকের শেষ ও দুই হাজারের শুরুর বছরগুলোতে বাংলাদেশের অডিও অ্যালবাম শিল্পের স্বর্ণযুগ। সেই সময় আরমান খান দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত সংগীত পরিচালক ছিলেন। মাত্র তিন বছরে (২০০২-২০০৫) তিনি প্রায় ২৩টি অ্যালবাম সম্পন্ন করেন। সেই সময় তিনি প্রায় সব জনপ্রিয় শিল্পীর সঙ্গে কাজ করেছেন।
| বছর | সম্পন্ন অ্যালবাম | উল্লেখযোগ্য কাজ |
|---|---|---|
| ২০০২ | ৮ | ‘দোকান’, ‘তিন সত্যি’ |
| ২০০৩ | ৭ | ‘লাল বন্ধু নীল বন্ধু’, নাটকের সংগীত |
| ২০০৪ | ৫ | ‘ঘটক’, ‘দোস্ত দুশমন’ |
| ২০০৫ | ৩ | একক গান, আবহসংগীত নাটক |
নাটকের ক্ষেত্রে, তাঁর আবহসংগীতের যাত্রা শুরু হয় ‘জোয়ার ভাটা’ দিয়ে। পরবর্তী সময়ে ১২শ’াধিক নাটকের সংগীত পরিচালনা করেছেন। তাঁর সূক্ষ্ম সঙ্গীতজ্ঞানের কারণে নাটকের আবহে সঠিক স্থানে সুর ও নীরবতার ব্যবস্থাপনা ছিল অনন্য।
সংগীত থেকে সরে যাওয়া
সাফল্যের পাশাপাশি হতাশা আসে। আরমান খান দেখেন, মঞ্চের শিল্পীরা ভালো পারিশ্রমিক পান, কিন্তু গীতিকার ও যন্ত্রশিল্পীদের সম্মানী অনেক কম। অডিও ক্যাসেট ও পরবর্তীতে সিডি ও পাইরেসির কারণে শিল্পীদের আর্থিক নিরাপত্তা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তাই তিনি সংগীতাঙ্গন থেকে সরে দাঁড়ান।
২০১৩ সালে তিনি হোটেল খাতে যোগ দেন। শ্রীমঙ্গলের গ্র্যান্ড সুলতান হোটেলে বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের প্রধান থেকে বর্তমানে মহাব্যবস্থাপক। ২০১৯ সালে আতিথেয়তা খাতে সেরা পরিচালকের পুরস্কার পান। সংগীতের মতোই এখানে ধৈর্য, নিষ্ঠা ও নেতৃত্বগুণ ব্যবহার করে সফল হয়েছেন।
সংগীতের সঙ্গে দূরত্ব ও নতুন সংযোগ
সংগীত ছেড়ে দিয়েছেন না। ২০২১ সালে প্রকাশ করেছেন ‘বন্ধু’, ২০২২ সালে আজম খানের স্মরণে ‘গুরু রে’। এছাড়া করোনার সময়ে ইউটিউব চ্যানেল ‘বেস্ট অ্যান্ড গ্রেট’-এ প্রবীণ সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে গল্প ও গান তুলে ধরেন।
পারিবারিক জীবন ও নিভৃততা
স্ত্রী এমি খান, এক ছেলে আরহাম ও মেয়ে আনতারা রাইসা—এই ছোট সংসারই তাঁর পৃথিবী। পিয়ানো সামনে বসে সুর খোঁজা বা বাবা-মায়ের কবরের পাশে নীরব সময় কাটানোই এখন তাঁর আনন্দ।
আজ জন্মদিনে অলোচনার কেন্দ্রে নেই তিনি, তবু তাঁর গান এখনো মানুষের উৎসব ও আনন্দের অংশ। সময় বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু আরমান খানের সুরের আবেদন এখনো অম্লান।
