২০২৬-২৭ মৌসুমের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মূল পর্ব শুরু হচ্ছে আজ। নতুন মৌসুমে ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই প্রতিযোগিতায় ৩৬টি দল লিগ পর্বে অংশ নেবে। আটটি ম্যাচদিনে প্রতিটি দল নির্ধারিত প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলবে। গত দুই মৌসুমে চালু হওয়া নতুন লিগ কাঠামো এবারও বহাল থাকছে, তবে মাঠের শৃঙ্খলা, সময় নষ্ট, ভিডিও সহকারী রেফারি এবং হলুদ কার্ডের হিসাব নিয়ে বেশ কিছু নিয়মে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
গত মে মাসে আর্সেনালকে টাইব্রেকারে হারিয়ে দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা জিতেছিল প্যারিস সেন্ট-জার্মেই। এবার লুইস এনরিকের দল শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে। ইউরোপিয়ান ফুটবলে টানা তৃতীয়বার ট্রফি জয়ের স্বপ্ন নিয়েই শুরু হবে তাদের নতুন অভিযান। তবে পথটা সহজ হওয়ার কথা নয়। আর্সেনাল, ম্যানচেস্টার সিটি, লিভারপুল, বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ ও বায়ার্ন মিউনিখের মতো শক্তিশালী দলগুলোও এবার শিরোপার অন্যতম দাবিদার।
প্রথম বাধা অবশ্যই লিগ পর্ব। এখানে ৩৬ দলের মধ্যে শীর্ষ আটটি দল সরাসরি শেষ ষোলোতে উঠবে। নবম থেকে ২৪তম স্থানে থাকা দলগুলোকে খেলতে হবে নকআউট প্লে-অফ। আর ২৫তম থেকে ৩৬তম অবস্থানে থাকা দলগুলোর ইউরোপিয়ান অভিযানের এখানেই শেষ হবে। অর্থাৎ লিগ পর্বের প্রতিটি পয়েন্ট এবং গোলের ব্যবধানই পরবর্তী ধাপের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সময় নষ্টে আরও কড়াকড়ি
নতুন মৌসুমে ম্যাচের কার্যকর সময় ধরে রাখতে রেফারিদের আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বদলি হওয়া খেলোয়াড়কে মাঠ ছাড়ার সময়ও নির্ধারিত করা হয়েছে। এখন থেকে বদলি খেলোয়াড়ের জন্য ১০ সেকেন্ডের মধ্যে মাঠ ছাড়ার প্রত্যাশা থাকবে। তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বের না হলে নতুন খেলোয়াড়কে এক মিনিট পর্যন্ত খেলা বন্ধ থাকার পর প্রথম সুযোগে মাঠে ঢুকতে হতে পারে।
থ্রো-ইন এবং গোলকিকের ক্ষেত্রেও সময়ক্ষেপণ ঠেকাতে রেফারি পাঁচ সেকেন্ডের গণনা দিতে পারবেন। কোনো দল এই নির্দেশনা না মানলে থ্রো-ইনের অধিকার প্রতিপক্ষের কাছে চলে যেতে পারে। একইভাবে গোলরক্ষক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গোলকিক না নিলে প্রতিপক্ষ দল কর্নার পাওয়ার সুযোগ পাবে।
চিকিৎসার প্রয়োজন হলে নতুন নিয়মে মাঠের বাইরে থাকার সময়ও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। চিকিৎসা নেওয়া খেলোয়াড়কে সাধারণভাবে অন্তত এক মিনিট মাঠের বাইরে থাকতে হবে এবং এরপরই তিনি ফিরে আসতে পারবেন। তবে গোলরক্ষকদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়।
অবশ্য সব পরিস্থিতিতে এক মিনিটের নিয়ম কার্যকর হবে না। কোনো খেলোয়াড় ফাউলের শিকার হওয়ার পর সেই ঘটনায় প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় হলুদ বা লাল কার্ড পেলে আহত খেলোয়াড়ের ওপর এই অপেক্ষার বিধান প্রযোজ্য হবে না।
ভিএআরের আওতা বাড়ছে
২০২৬-২৭ মৌসুমে ভিডিও সহকারী রেফারির ব্যবহারের ক্ষেত্রও কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। রেফারি যদি ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দেন, তাহলে ভিডিও সহকারী রেফারি হস্তক্ষেপ করতে পারবেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে পুরো ঘটনাটির নতুন করে বিচার হবে; ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়ার বিষয়টিই সংশোধনের আওতায় থাকবে।
দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ভিএআর কর্মকর্তারা হস্তক্ষেপ করতে পারবেন। এমন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মাঠের রেফারিকে সাইডলাইনের মনিটরে গিয়ে ঘটনাটি পুনরায় দেখার সুযোগ দেওয়া হবে।
কর্নার বা ফ্রি-কিক নেওয়ার ঠিক আগে আক্রমণকারী দলের ফাউল হয়েছে কি না, সেটিও এখন ভিএআরের হস্তক্ষেপের আওতায় আসতে পারে। গোলকিক থেকে সম্ভাব্য হ্যান্ডবলের বিষয়েও পরিষ্কার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
তবে কর্নারের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভিএআর ব্যবহারে উয়েফা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। সিদ্ধান্ত বদলানোর ক্ষেত্রে ঘটনাটি সম্পূর্ণ স্পষ্ট হতে হবে এবং পর্যালোচনার কারণে খেলায় অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব তৈরি করা যাবে না।
মুখ ঢাকলে হলুদ কার্ড
প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের সময় জার্সি দিয়ে মুখ ঢাকার প্রবণতাও নতুন মৌসুমে আলোচনায় থাকবে। গত ফেব্রুয়ারিতে বেনফিকার জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ান্নি ও রিয়াল মাদ্রিদের ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মধ্যকার এক ঘটনার পর বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে আসে। প্রথমে বর্ণবাদী মন্তব্যের অভিযোগ উঠলেও পরবর্তী তদন্তে প্রেস্তিয়ান্নিকে সমকামী-বিদ্বেষী আচরণের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তাঁকে ছয় ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, যার তিনটি স্থগিত ছিল।
ফিফা পরে ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য আরও কঠোর অবস্থান নেয়। প্রতিপক্ষের সঙ্গে বাগবিতণ্ডার সময় মুখ ঢাকার ঘটনাকে লাল কার্ডের আওতায় আনা হয়। সেই নিয়মে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে তুরস্কের ম্যাচে মিগেল আলমিরন প্রথম বহিষ্কৃত খেলোয়াড় হন। পরে শেষ ষোলোতে মেক্সিকোর বিপক্ষে ইকুয়েডরের পিয়েরো ইনকাপিয়েও একই নিয়মে লাল কার্ড দেখেন।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে অবশ্য উয়েফা সরাসরি লাল কার্ডের পথ নেয়নি। কোনো খেলোয়াড় অখেলোয়াড়সুলভ আচরণের অংশ হিসেবে মুখ ঢাকলে রেফারি তাঁকে হলুদ কার্ড দেখাতে পারবেন। গুরুতর কোনো আচরণ হলে ম্যাচের পরও তদন্ত করে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
হলুদ কার্ডের হিসাবেও পরিবর্তন
হলুদ কার্ড জমে নিষেধাজ্ঞার নিয়মেও পরিবর্তন এসেছে। আগের ব্যবস্থায় তিনটি হলুদ কার্ড জমলে প্রথম নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতো। এরপর পাঁচ ও সাতটি হলুদ কার্ডে পরবর্তী নিষেধাজ্ঞা আসত।
নতুন মৌসুমে প্রথম নিষেধাজ্ঞার জন্য চারটি হলুদ কার্ড জমতে হবে। এরপর ছয়, আট ও দশটি হলুদ কার্ডের পর্যায়ে গেলে পরবর্তী নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। এতে খেলোয়াড়দের জন্য কিছুটা বাড়তি সুযোগ তৈরি হলেও নিয়মিত কার্ড পাওয়া ফুটবলারদের জন্য সতর্কতার প্রয়োজন থাকবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো কোয়ার্টার ফাইনাল শেষে হলুদ কার্ডের হিসাব মুছে যাবে। ফলে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত জমা হওয়া হলুদ কার্ড সেমিফাইনালের ওপর প্রভাব ফেলবে না। তবে কোনো খেলোয়াড় সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগে লাল কার্ড দেখলে সেই বহিষ্কারই তাঁকে ফাইনাল থেকে ছিটকে দিতে পারে।
নতুন কাঠামোর তৃতীয় মৌসুমে তাই চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শুধু বড় দলগুলোর শিরোপার লড়াই নয়; রেফারিং, সময় ব্যবস্থাপনা এবং শৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। আজ থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ অভিযানে এসব পরিবর্তনের প্রভাব ম্যাচের ফলাফলেও কতটা পড়ে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।










