কারও কাছে তিনি ‘গুরু’, আবার কারও কাছে ‘নগর বাউল’। ভক্তদের দেওয়া এসব পরিচয়ের প্রতি বরাবরই নিজের স্বভাবসুলভ নির্লিপ্ততা দেখিয়েছেন জেমস। তবে মঞ্চে গিটার হাতে উঠলেই তার কণ্ঠে ফুটে ওঠে সেই চেনা আত্মবিশ্বাস, যা কয়েক দশক ধরে অসংখ্য শ্রোতাকে মুগ্ধ করে আসছে।
ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস—সংগীতাঙ্গনে যিনি শুধু জেমস নামেই পরিচিত। ২ অক্টোবর ২০২৬, শুক্রবার, বাংলাদেশের এই জনপ্রিয় রকশিল্পী ৬২ বছরে পা দিয়েছেন। নওগাঁয় জন্ম হলেও তার বেড়ে ওঠা এবং সংগীতজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর সূচনা চট্টগ্রামে।
জেমসের বাবা ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। পরবর্তী সময়ে তিনি চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন। সংগীতকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারের পুরোপুরি সমর্থন শুরুতে পাননি জেমস। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে একসময় তিনি ঘর ছেড়ে চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিংয়ে ওঠেন। সেখান থেকেই তার সংগীতজীবনের বড় অধ্যায়ের সূচনা।
১৯৮০ সালে জেমস প্রতিষ্ঠা করেন ব্যান্ড ‘ফিলিংস’। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত হয় ব্যান্ডটির প্রথম অ্যালবাম ‘স্টেশন রোড’। এর পরের বছর একক অ্যালবাম ‘অনন্যা’ প্রকাশের মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি। অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের অন্যতম পরিচিত কণ্ঠ হয়ে ওঠেন জেমস।
নব্বইয়ের দশকেও একের পর এক অ্যালবাম দিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করেন তিনি। ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয় ‘জেল থেকে বলছি’, ১৯৯৬ সালে ‘নগর বাউল’, ১৯৯৮ সালে ‘লেইস ফিতা লেইস’ এবং ১৯৯৯ সালে ‘কালেকশন অব ফিলিংস’। পরবর্তী সময়ে ‘ফিলিংস’ ভেঙে নতুন লাইনআপে ‘নগর বাউল’ নামে ব্যান্ড গড়ে তোলেন জেমস। ‘দুষ্টু ছেলের দল’ ও ‘বিজলি’সহ বিভিন্ন কাজের মধ্য দিয়ে এই নামটিও তার সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
একক শিল্পী হিসেবেও জেমসের রয়েছে দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় অ্যালবামভাণ্ডার। ‘পালাবি কোথায়’ (১৯৯৫), ‘দুঃখিনী দুঃখ করোনা’ (১৯৯৭), ‘ঠিক আছে বন্ধু’ (১৯৯৯), ‘আমি তোমাদেরই লোক’ (২০০৩), ‘জনতা এক্সপ্রেস’ (২০০৫), ‘তুফান’ (২০০৬) এবং ‘কাল যমুনা’ (২০০৯) তার উল্লেখযোগ্য একক অ্যালবাম।
বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে জেমসের সংগীতযাত্রা নতুন মাত্রা পায় ২০০৪ সালে। ওই বছর কলকাতার সংগীত পরিচালক প্রিতমের সঙ্গে কাজ করেন তিনি। পরের বছর হিন্দি চলচ্চিত্র ‘গ্যাংস্টার’-এ প্লেব্যাকের মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক হয় তার। ‘ভিগি ভিগি’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং ভারতীয় শ্রোতাদের কাছেও জেমসের কণ্ঠ নতুন করে পরিচিত হয়ে ওঠে।
২০০৬ সালেও বলিউডের ছবিতে কণ্ঠ দেন তিনি। ২০০৭ সালে ‘লাইফ ইন এ মেট্রো’ চলচ্চিত্রে তার গাওয়া ‘রিশতে’ ও ‘আলবিদা’ গান দুটি শ্রোতাদের মধ্যে সাড়া ফেলে। বাংলা রক সংগীতের একজন শিল্পী হিসেবে হিন্দি চলচ্চিত্রে তার এই উপস্থিতি তাকে দেশের বাইরেও আরও বড় শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেয়।
চলচ্চিত্রে তার পরবর্তী উল্লেখযোগ্য কাজ আসে ২০১৭ সালে ‘সত্ত্বা’ ছবিতে। এতে জেমসের গাওয়া ‘তোর প্রেমেতে অন্ধ আমি’ গানটি জনপ্রিয়তা অর্জন করে। গানটি ওই বছর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও লাভ করে।
রেকর্ড করা গান ও অ্যালবামের পাশাপাশি জেমসের ক্যারিয়ারে মঞ্চের গুরুত্ব বরাবরই আলাদা। দেশজুড়ে কনসার্টের পাশাপাশি বিদেশেও নিয়মিত গান পরিবেশন করে আসছেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়াতেও কনসার্ট করেছেন এই শিল্পী। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশাপাশি তার সংগীতের প্রতি আগ্রহী বিভিন্ন শ্রোতার কাছেও এসব আয়োজন জেমসের গানকে নতুনভাবে পৌঁছে দেয়।
জেমসের বহুল পরিচিত গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বাংলাদেশ’, ‘জেল থেকে আমি বলছি’, ‘মা’, ‘দুঃখিনী দুঃখ করো না’, ‘লেইস ফিতা লেইস’, ‘বাবা কতো দিন’, ‘বিজলী’, ‘দুষ্টু ছেলের দল’, ‘মিরাবাঈ’, ‘পাগলা হাওয়া’ এবং ‘গুরু ঘর বানাইলা কী দিয়া’। ভিন্ন সময়ের এসব গান তার দীর্ঘ সংগীতজীবনের নানা দিককে তুলে ধরে।
চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিং থেকে শুরু হওয়া সেই যাত্রা আজ ছয় দশকেরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। ব্যান্ড সংগীত, একক অ্যালবাম, চলচ্চিত্রের গান এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চ—বিভিন্ন পর্ব পেরিয়ে জেমস নিজের জন্য তৈরি করেছেন স্বতন্ত্র এক সংগীতপরিচয়।
৬২ বছর বয়সেও মঞ্চে তার উপস্থিতি শ্রোতাদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে। কয়েক দশকের গান, স্বতন্ত্র কণ্ঠ এবং নিজস্ব পরিবেশনাভঙ্গির কারণে জেমসের সংগীতজীবন বাংলাদেশের জনপ্রিয় রক সংগীতের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে আছে।









