বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকট এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বিগত সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর দায়ভার নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। রোববার (২৬ জানুয়ারি, ২০২৬) সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল ও পায়রা বন্দরের মতো উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ ‘অযাচিত’ ব্যয়ের কারণে রাষ্ট্রকে বিশাল ঋণের বোঝা বইতে হচ্ছে। এই ঋণের চাপ এবং গত ১৫ বছরে টাকার মানের ৪৬ শতাংশ অবমূল্যায়ন সরাসরি সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রভাব ফেলেছে, যার ফলে চালসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
Table of Contents
ঋণের বোঝা ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের অভাব
বাণিজ্য উপদেষ্টা তথ্য প্রদান করেন যে, ২০০৮ সালে বাংলাদেশের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ কোটি টাকা, যা বিগত সরকারের আমল শেষে প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। এই ঋণের সিংহভাগই ব্যয় হয়েছে এমন সব প্রকল্পে যেখান থেকে রিটার্ন বা আয় অত্যন্ত নগণ্য। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, পদ্মা রেলসেতু থেকে যেখানে ১,৪০০ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল, সেখানে বাস্তবে আয় হয়েছে মাত্র ২৬ কোটি টাকা। এই বিশাল আর্থিক ঘাটতি মেটাতে কৃষি খাতের বরাদ্দ সংকুচিত হয়েছে।
মেগা প্রকল্পের পূর্বাভাস বনাম বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার তুলনা:
| সূচক বা খাতের বিবরণ | সরকারি লক্ষ্যমাত্রা/দাবি | বর্তমান বাস্তব চিত্র (২০২৬) |
| পদ্মা রেলসেতু থেকে আয় | বার্ষিক ১,৪০০ কোটি টাকা। | অর্জিত হয়েছে মাত্র ২৬ কোটি টাকা। |
| জিডিপি প্রবৃদ্ধি (পদ্মা সেতু) | ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বাড়বে। | প্রবৃদ্ধি বাড়েনি, উল্টো নিম্নমুখী। |
| জাতীয় ঋণের পরিমাণ | ২ লাখ কোটি টাকা (২০০৮)। | বর্তমানে প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকা। |
| টাকার অবমূল্যায়ন | নিয়ন্ত্রিত বিনিময় হার। | গত ১৫ বছরে ৪৬% মান কমেছে। |
| কৃষি খাতে বিনিয়োগ | সীমিত বরাদ্দ ও উচ্চ খরচ। | সেচ ও সারে বিনিয়োগের ঘাটতি। |
পদ্মা সেতুর প্রভাবে চালের দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতা
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা তাঁর আগের একটি বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, যদি পদ্মা সেতু বা টানেলের মতো প্রকল্পে ঋণের ওপর ভিত্তি করে অঢেল অর্থ ব্যয় না করে সেই টাকা কৃষি উৎপাদন, উন্নত সেচ ব্যবস্থা এবং সার আমদানিতে ব্যয় করা হতো, তবে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসত। ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারকে ভর্তুকি কমাতে হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে টাকার মান কমায় আমদানিকৃত কৃষি উপকরণের দাম বেড়েছে। এই কাঠামোগত দুর্বলতাই চালের বাজারে প্রভাব ফেলেছে এবং পরোক্ষভাবে দাম কেজিতে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
রমজানে বাজার স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা
মেগা প্রকল্পের নেতিবাচক প্রভাব সত্ত্বেও আসন্ন রমজানে সাধারণ মানুষের জন্য আশার কথা শুনিয়েছেন শেখ বশিরউদ্দীন। তিনি জানান, গত বছরের তুলনায় এবার নিত্যপণ্যের আমদানির পরিমাণ প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে মার্কিন ডলারের সংকট নেই এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকায় আমদানিকারকরা স্বস্তিতে রয়েছেন।
রমজানকে কেন্দ্র করে বর্তমান বাজার পরিস্থিতির চিত্র:
আমদানিতে উল্লম্ফন: গত বছরের চেয়ে ৪০% বেশি পণ্য ইতোমধ্যে আমদানি হয়েছে।
ডলারের সহজলভ্যতা: ব্যবসায়ীদের এলসি (LC) খোলার ক্ষেত্রে ডলারের বড় কোনো সংকট নেই।
গ্যাস সরবরাহ: কলকারখানায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাজারের প্রবণতা: অধিকাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজার বর্তমানে নিম্নমুখী।
ব্যবসায়ীদের প্রতিশ্রুতি: টাস্কফোর্সের বৈঠকে ব্যবসায়ীরা রমজানে দাম না বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন।
উপসংহার
বাণিজ্য উপদেষ্টার এই বিশ্লেষণ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মেগা প্রকল্পের নামে গৃহীত ঋণের বোঝা এখন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চেপে বসেছে। ঋণের মাধ্যমে উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। তবে মুদ্রাবাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হওয়ার ফলে আসন্ন রমজানে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে জোরালো আশ্বাস পাওয়া গেছে।
