অকটেন বিরোধে ভয়াবহ আগুনে কারখানা ধ্বংস তিন দগ্ধ

কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায় অকটেন ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের মধ্যে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব থেকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে দুটি প্লাস্টিক কারখানা সম্পূর্ণভাবে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে এবং তিনজন শ্রমিক গুরুতরভাবে দগ্ধ হয়েছেন। শনিবার (১৮ এপ্রিল) বিকেলে উপজেলার কালাকচুয়া সংলগ্ন শাহদৌলতপুর গ্রামে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, কারখানা এলাকায় কয়েকজন শ্রমিকের মধ্যে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত অকটেন ভাগাভাগি নিয়ে প্রথমে তর্কবিতর্ক শুরু হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তা উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে রূপ নেয় এবং ধস্তাধস্তিতে পরিণত হয়। এ সময় অসাবধানতাবশত কেউ বিড়ি বা সিগারেট জ্বালালে তার আগুনের স্ফুলিঙ্গ পাশের প্লাস্টিক কারখানায় পড়ে যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্লাস্টিকজাত দাহ্য পদার্থ থাকায় মুহূর্তের মধ্যেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো এলাকা আগুনে রূপ নেয়।

খবর পেয়ে বুড়িচং ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে ততক্ষণে কারখানার ভেতরে থাকা কাঁচামাল, উৎপাদিত পণ্য ও মেশিনারি সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যায়। প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫ থেকে ১৭ লাখ টাকা ধরা হলেও স্থানীয়দের ধারণা, প্রকৃত ক্ষতি আরও বেশি হতে পারে।

দগ্ধদের অবস্থা

অগ্নিকাণ্ডে আহত তিন শ্রমিককে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাদের অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়।

নামবয়সঅবস্থা
মো. সোলাইমান৩২ বছরআশঙ্কাজনক
তানভীর হোসেন১৯ বছরগুরুতর দগ্ধ
মো. শুভঅজ্ঞাতআশঙ্কাজনক

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দগ্ধদের শরীরের বড় অংশ পুড়ে যাওয়ায় তাদের অবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কারখানা মালিকদের ক্ষোভ ও হতাশা

কারখানার মালিক বিল্লাল হোসেন ও নজরুল ইসলাম জানান, ঘটনার সময় তারা কারখানার ভেতরেই ছিলেন। হঠাৎ আগুন লাগার চিৎকার শুনে বাইরে বের হয়ে দেখেন মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা আগুনে গ্রাস করেছে।

তারা বলেন, “আমরা কোনোভাবে প্রাণে বেঁচে গেছি, কিন্তু আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। কাঁচামাল, মেশিন, সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।”

প্রশাসনিক তদন্ত ও পদক্ষেপ

বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লুৎফুর রহমান জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি দুর্ঘটনা মনে হলেও প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে।

তিনি আরও জানান, ঘটনাটি নাশকতা নাকি অবহেলাজনিত দুর্ঘটনা—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজও চলছে।

শিল্প নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

স্থানীয় বাসিন্দা ও শ্রমিকদের অভিযোগ, এলাকায় অবস্থিত ছোট ও মাঝারি শিল্পকারখানাগুলোতে দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণে কোনো পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। পাশাপাশি শ্রমিকদের মধ্যে জ্বালানি ব্যবহার ও ভাগাভাগি নিয়ে প্রায়ই বিরোধ দেখা দেয়, যা কখনো কখনো বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্লাস্টিক ও রাসায়নিক উপাদানযুক্ত কারখানায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলে সামান্য আগুনও দ্রুত ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে অকটেন, প্লাস্টিক কাঁচামাল ও তেলজাতীয় পদার্থ একসঙ্গে থাকলে বিস্ফোরণের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

সার্বিক পরিস্থিতি

অকটেন ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া একটি সাধারণ বিরোধ যে এত বড় অগ্নিকাণ্ডে রূপ নেবে, তা কেউই অনুমান করেনি। এতে যেমন তিনজন শ্রমিক জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, তেমনি দুই কারখানার মালিক বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

এই ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে শিল্প এলাকা