ভারতের কয়েকটি মারাত্মক প্রজাতির সাপ—বিশেষ করে গোখরা (Monocled Cobra) ও ক্রাইট (Krait)—মৃত্যুর ঘণ্টাখানেক পরও বিষ ছড়াতে সক্ষম। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই চমকপ্রদ তথ্য। এর মূল কারণ, এসব সাপের বিশেষ ধরনের বিষ নিঃসরণ ব্যবস্থা।
বুধবার (২০ আগস্ট) রাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
আগে মনে করা হতো, কেবল ঝুনঝুনি সাপ বা থুথু ছোড়া গোখরার মতো কিছু বিশেষ প্রজাতিই মৃত্যুর পরও বিষ ছড়াতে পারে। কিন্তু আসামে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতীয় মনোকল্ড গোখরা ও কালো ক্রাইট মৃত্যুর পরও মারাত্মক ক্ষতি করতে সক্ষম। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Frontiers in Tropical Diseases জার্নালে।
এই গবেষণা পরিচালনা করেছেন আসামের নামরূপ কলেজের সুশমিতা ঠাকুরের নেতৃত্বে একদল গবেষক। তারা বাস্তবে ঘটিত তিনটি ঘটনা নথিবদ্ধ করেছেন—দুটি গোখরা এবং একটি কালো ক্রাইটের কামড়ের ঘটনা, যা রিপোর্ট করা হয়েছিল আসামের গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে।
ঘটনা–১: মৃত গোখরার বিচ্ছিন্ন মাথার কামড়
৪৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি বাড়িতে মুরগির ওপর হামলা করা একটি গোখরার মাথা কেটে ফেলেন। পরে মৃত সাপটির দেহ সরাতে গেলে বিচ্ছিন্ন মাথাটি তার বুড়ো আঙুলে কামড় দেয়।
- সঙ্গে সঙ্গে তীব্র ব্যথা শুরু হয়, যা কাঁধ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
- হাসপাতালে গিয়ে তিনি বমি, অসহ্য যন্ত্রণা এবং কালো হয়ে যাওয়া ক্ষতের উপসর্গ জানান।
- চিকিৎসকরা নিশ্চিত হন যে এটি মনোকল্ড গোখরার কামড়।
তাকে ইনট্রাভেনাস অ্যান্টিভেনম ও ব্যথানাশক দেওয়া হয়। দীর্ঘ ২০ দিনের চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন।
ঘটনা–২: চাপা পড়ে মৃত ভেবে ফেলা গোখরা
এক কৃষক ধানক্ষেতে কাজ করার সময় ট্র্যাক্টরের নিচে একটি গোখরা চাপা পড়ে। কয়েক ঘণ্টা পর মৃত ভেবে ফেলে রাখা হলেও সেটি কৃষকের পায়ে কামড় দেয়।
- কামড়ের ফলে তীব্র ব্যথা, ফোলা ও রঙ পরিবর্তন হয়।
- তিনি দু’বার বমি করেন, তবে স্নায়ুজনিত বিষক্রিয়া হয়নি।
- ক্ষতস্থানে আলসার তৈরি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার প্রয়োজন হয়।
গবেষকদের ভাষায়— “চাপা পড়ে মৃত বলে ধরা হলেও সাপটি বিষ ছড়াতে সক্ষম ছিল।”
ঘটনা–৩: মৃত কালো ক্রাইটের বিষাক্ত কামড়
একটি কালো সাপকে হত্যা করে উঠোনে ফেলে রাখা হয়। পরে এক প্রতিবেশী সাপটির মাথা হাতে নিলে সেটি তার আঙুলে কামড় দেয়।
- কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভুক্তভোগীর চোখের পাতা ঢলে পড়ে এবং গিলতে সমস্যা হয়।
- চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন, এটি একটি কালো ক্রাইট, যা তিন ঘণ্টা আগে মারা গিয়েছিল।
- হাসপাতালে তাকে ২০ ভায়াল অ্যান্টিভেনম দেওয়া হলেও অবস্থার অবনতি হয়।
তিনি সম্পূর্ণ অবশ হয়ে পড়েন এবং অচেতন হয়ে যান। পরবর্তীতে টানা ৪৩ ঘণ্টা লাইফ সাপোর্টে রাখার পর ধীরে ধীরে সুস্থ হতে থাকেন এবং ছয় দিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পান।
গবেষকদের মতে—
- কিছু প্রজাতির সাপ মারাত্মক আঘাত পেয়ে মারা যাওয়ার পরও বিষ ছড়াতে সক্ষম।
- তাদের বিষগ্রন্থি ফাঁপা দাঁতের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ফলে মাথা বিচ্ছিন্ন অবস্থায়ও চাপ পড়লে বা কেউ ভুল করে স্পর্শ করলে বিষ বের হয়ে আসতে পারে।
- এই বিষ ছড়ানোর প্রক্রিয়া জীবিত সাপের কামড়ের মতোই ভয়াবহ উপসর্গ তৈরি করতে পারে।
তাই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন—মৃত বলে ধারণা করা হলেও বিষধর সাপকে কখনও সরাসরি স্পর্শ করা উচিত নয়।