বিশ্বের ইতিহাসে এমন কিছু ব্যতিক্রমী মানুষ রয়েছেন, যাঁদের জীবন শুধু তাঁদের নিজেদের নয়—সমগ্র জাতির জন্য হয়ে ওঠে অনুপ্রেরণার প্রতীক। ড. আতিউর রহমান তাঁদেরই একজন, যাঁর জীবনের গল্প বলে দেয়—সংগ্রাম, সততা ও শিক্ষার শক্তি থাকলে কোনও স্বপ্নই অধরা নয়।
শৈশবের সংগ্রাম: দুধ বিক্রেতা রাখাল থেকে আলোর পথে
১৯৫১ সালের ৩ আগস্ট, জামালপুর জেলার দিঘপাইত ইউনিয়নের দিঘুলী গ্রামে এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আতিউর রহমান। শৈশবে তিনি ছিলেন এক রাখাল বালক, যিনি গৃহপালিত গাভির দুধ কাঁধে নিয়ে হাটে বিক্রি করতেন নিজের পড়ালেখার খরচ চালানোর জন্য।
তিনি নিজের কণ্ঠেই স্বীকার করেছেন:
“অনেকের কাছ থেকে অর্থ, উৎসাহ ও ভালোবাসা পেয়েছি, সেই ঋণ আমি কখনও শোধ করতে পারিনি, এমনকি শোধ করার সাহসও হয়নি।”
শিক্ষাজীবনের অগ্রযাত্রা
| ধাপ | প্রতিষ্ঠান | সাফল্য |
| মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক | মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ, টাঙ্গাইল | কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ |
| স্নাতক ও স্নাতকোত্তর | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অর্থনীতি বিভাগ | শ্রেষ্ঠত্বে উত্তীর্ণ |
| পিএইচডি | SOAS, University of London (কমনওয়েলথ স্কলারশিপে) | ১৯৭৭ সালে অর্জন |
তাঁর পিএইচডি গবেষণা “Peasants and Classes” পরবর্তীতে Oxford University Press থেকে গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়ে বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
গবেষণা থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্ব
ড. আতিউর রহমান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (BIDS)–এ দীর্ঘ ২৮ বছর গবেষণা করেন এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসেবে অবসর নেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দশম গভর্নর
১ মে ২০০৯ সালে তিনি দায়িত্ব নেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে। তাঁর নেতৃত্বে:
- কেন্দ্রীয় ব্যাংক হয়ে ওঠে দরিদ্রবান্ধব ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর
- আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও সবুজ ব্যাংকিং ধারণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়
- তিনি ‘মডেল গভর্নর’ হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও খ্যাতি অর্জন করেন
তিনি সোনালী ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক–এর বোর্ডেও দায়িত্ব পালন করেন।
উন্নয়ন, মানবিকতা ও লেখালেখি
১৯৯৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “উন্নয়ন সমন্বয়” নামক একটি এনজিও, যার মাধ্যমে তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিষয়ক ৭০টিরও বেশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রকল্পে পরিচালক বা টিম লিডার হিসেবে কাজ করেছেন।
তিনি একজন জনপ্রিয় কলাম লেখকও বটে। দারিদ্র্য হ্রাস, বাজেট বিশ্লেষণ, মানবিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক বৈষম্য ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর লেখাগুলো বিশ্লেষণধর্মী, প্রজ্ঞাপূর্ণ এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য পথনির্দেশক।
পুরস্কার ও সম্মাননা
| বছর | সম্মাননা |
| ২০০০ | অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণপদক |
| ২০০৮ | চন্দ্রাবতী স্বর্ণপদক |
তাঁর লেখনী ও গবেষণাকর্মের জন্য তিনি দেশ-বিদেশের অসংখ্য পুরস্কার ও স্বীকৃতি লাভ করেছেন।
জন্মদিনে শুভেচ্ছা
আজ ড. আতিউর রহমানের জন্মদিন—এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত উদযাপন নয়, বরং একটি জাতীয় অনুপ্রেরণার দিন, যা তরুণদের মনে সাহস জোগায়।
শুভ জন্মদিন, ড. আতিউর রহমান!
আপনার জীবন যেন প্রমাণ করে—
সংগ্রাম থেকে সাফল্যে পৌঁছানো সম্ভব, সততা ও জ্ঞানের আলোয়।
