দেইল্লা রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী

“দেইল্লা রাজাকার” থেকে “আল্লামা সাঈদী” হয়ে ওঠার যে গল্প, তা অনেকেরই অজানা। আজ যিনি ধর্মীয় লেবাসে নিজেকে ঢেকে রেখেছেন, একসময় তিনি ছিলেন যুদ্ধাপরাধের ভয়াবহতম এক অধ্যায়ের কুশীলব। তার বর্তমান পরিচয় যতই গোঁজামিল দেওয়া হোক না কেন, অতীতের নির্মম সত্যগুলো আজও ইতিহাসে অমলিন।

দেইল্লা রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী
দেইল্লা রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী

 

১৯৭১ সালের আগপর্যন্ত তিনি ছিলেন এক সাধারণ মুদি দোকানদার ও তাবিজ বিক্রেতা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি মুখোশ খুলে পাকিস্তানি হানাদারদের দোসর হয়ে উঠলেন। প্রথমে শান্তি কমিটির সদস্য, পরে রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার—এই রূপান্তর ঘটে চরম বিশ্বাসঘাতকতায়। তার নেতৃত্বে ও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে সংঘটিত হয় হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটসহ নানা মানবতাবিরোধী অপরাধ। সেই সময় থেকেই ‘দেইল্লা’ নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘রাজাকার’—একটা নাম, যেটা হয়ে ওঠে ঘৃণার প্রতীক।

যুদ্ধ শেষ হলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গা ঢাকা দিয়ে আবির্ভূত হন নতুন পরিচয়ে—‘আল্লামা মাওলানা’। ওয়াজ মাহফিলে দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়িয়ে নিজেকে ধর্মীয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে থাকেন। পরে তিনি জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির হয়ে ওঠেন—যে দলটি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে।

তার প্রকৃত নাম ছিল দেলোয়ার হোসেন শিকদার, পিরোজপুর জেলার (বর্তমানে জিয়ানগর উপজেলা) সাউথখালী গ্রামে জন্ম ১৯৪০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। পিতা ছিলেন ইউসুফ আলী শিকদার। সবাই তাকে চিনত ‘দেইল্লা’ নামে।

নতুন পরিচয়ের আড়ালে একাত্তরের অপরাধ ঢাকতে তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন কাগজপত্র জালিয়াতির পথ। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির উপ-কমিটির তদন্ত অনুযায়ী, তিনি নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ জাল করেছিলেন। ১০ বছর বয়সে দাখিল পাসের জাল সনদে তার নাম লেখা হয় ‘মোস্তফা দেলাওয়ার হোসাইন’। আলিম সনদে তা বদলে হয়ে যায় ‘আবু নাঈম মো. দেলাওয়ার হোসাইন’। পরবর্তীতে এইসব নাম ও জন্ম তারিখ পাল্টে চূড়ান্তভাবে হাজির হন ‘দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী’ পরিচয়ে।

এই রূপান্তরের পেছনে ছিল এক সুপরিকল্পিত প্রতারণা—যেখানে ধর্মীয় আবরণ দিয়ে ঢাকা হয়েছে ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। সাঈদীর জীবন কেবল ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং ইতিহাসের এক অমোচনীয় দৃষ্টান্ত—যেখানে দেখা যায়, কিভাবে এক যুদ্ধাপরাধী নিজেকে ‘আল্লামা’ রূপে পুনঃস্থাপন করতে চেয়েছে, কিন্তু অতীত কখনও ধুলোচাপা পড়ে না।

 

দেইল্লা রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী

দেইল্লা রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী

 

জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকার কারণে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী শর্ষিনা মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কৃত হন। এরপর ভর্তি হন বারইপাড়া মাদ্রাসায়, যেখানে তিনি তৃতীয় বিভাগে আলিম পাস করেন। উচ্চশিক্ষা না থাকলেও তিনি নিজের নামের আগে ‘আল্লামা’ উপাধি ব্যবহার করতে শুরু করেন—যা তার প্রকৃত শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে খাপ খায় না।

মুক্তিযুদ্ধের আগে সাঈদী শ্বশুরবাড়িতে ঘরজামাই হিসেবে থাকতেন। সংসার চালাতে পারেরহাট বাজারে একটি ছোট মুদি দোকান খুলেছিলেন, তবে তার মূল পেশা ছিল তাবিজ-কবচ ও ঝাড়ফুঁক বিক্রি। লোকমুখে পরিচিত ছিলেন একজন ওঝা হিসেবে।

 

google news
গুগোল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

অভিযোগ রয়েছে, তিনি আরবি ও উর্দু ভাষায় ছিলেন দক্ষ এবং অত্যন্ত চতুর বক্তা। এই ভাষাগত দক্ষতা ও বাকপটুতাকেই কাজে লাগিয়ে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন। বিশেষ করে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন এজাজের সঙ্গে গড়ে ওঠে তার ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব। এই সখ্যতাই তাকে রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার হওয়ার পথ সুগম করে।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই তিনি শান্তি কমিটির সক্রিয় সদস্য হিসেবে যুক্ত হন। তার প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় পিরোজপুরের পারেরহাট বন্দরসহ আশপাশের এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকাররা চালায় হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও লুটপাটের মতো ভয়াবহ মানবতাবিরোধী অপরাধ।

তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যে অভিযোগপত্র গৃহীত হয়, তাতে রয়েছে ৮৮ পৃষ্ঠার সূচনা বক্তব্য এবং ৭৭ পৃষ্ঠার বিশদ তদন্ত প্রতিবেদন। এই দলিলে সাঈদীর বিরুদ্ধে আনীত হয় ২০টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • তিন হাজারেরও বেশি নিরস্ত্র মুক্তিকামী মানুষকে হত্যা বা হত্যায় সহযোগিতা,

  • অন্তত নয়জন নারীকে ধর্ষণ,

  • অসংখ্য বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ,

  • ১০০ থেকে ১৫০ হিন্দু নাগরিককে জোরপূর্বক ধর্মান্তর করতে বাধ্য করা।

এই মামলার বিচার শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে সাঈদীর বিরুদ্ধে ৮টি অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়। এর মধ্যে ৮ ও ১০ নম্বর অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। বাকি অভিযোগগুলোতেও অপরাধ প্রমাণিত হলেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় সেগুলোতে আলাদাভাবে সাজা ঘোষণা করা হয়নি।

অভিযোগে আরও বলা হয়, সাঈদী মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে নিজ এলাকায় আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী গঠনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখেন এবং পাকিস্তানি বাহিনীকে এসব বাহিনীর মাধ্যমে সক্রিয় সহযোগিতা করেন। যদিও তিনি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের দায়িত্বে ছিলেন না, তথাকথিত ‘মাওলানা’ পরিচয়ে স্বাধীনতাবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন ধর্মের নামে প্রতারণা করে।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে পিরোজপুর অঞ্চল ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার অন্যতম শিকার, আর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ছিলেন সেই ভয়াবহতা ও ধ্বংসযজ্ঞের অন্যতম হোতা। শুধু সহযোদ্ধা নয়, বরং তিনি নিজেই নেতৃত্ব দিয়েছেন হত্যাযজ্ঞে, ধর্ষণে, লুটপাটে—একটি জাতির মুক্তির সংগ্রামে সবচেয়ে জঘন্য ভূমিকা রেখে গেছেন।

 

দেইল্লা রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী
দেইল্লা রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী

 

সাঈদীর অপরাধ – ধর্ষণ:

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে ওঠা সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল নারীদের প্রতি তার বর্বর যৌন সহিংসতা।

সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি পিরোজপুরের পারেরহাট বন্দরের হিন্দু ব্যবসায়ী বিপদ সাহার মেয়ে ভানু সাহাকে তার বাড়িতে আটক রেখে নিয়মিত ধর্ষণ করতেন। অন্যান্য রাজাকারদের সহায়তায় সাঈদী দিনের পর দিন এই নারীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার করেন। একপর্যায়ে নির্যাতনের ভয়ে এবং সামাজিক লাঞ্ছনার আশঙ্কায় ভানু সাহা দেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে যান, যেখানে তিনি এখনো আশ্রিত আছেন।

মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে, সাঈদীর নেতৃত্বে একদল রাজাকার হুগলাবুনিয়া গ্রামে আক্রমণ চালায়। রাজাকারদের উপস্থিতি টের পেয়ে অধিকাংশ হিন্দু নারী পালিয়ে গেলেও শেফালী ঘরামী নামের এক নারী ঘর থেকে বের হতে পারেননি। অভিযোগ রয়েছে, সাঈদীর নেতৃত্বে রাজাকাররা তাকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে। এই ঘটনার ফলে তিনি একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। স্বাধীনতার পর সমাজের চাপে ও অপমান সহ্য করতে না পেরে শেফালী ঘরামীও দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হন।

আরেকটি নির্মম ঘটনায়, মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে সাঈদী রাজাকার বাহিনী নিয়ে গৌরাঙ্গ সাহার বাড়িতে হানা দেন। বাড়ির তিন মেয়ে—মহামায়া, অন্ন রানী ও কমলা রানী—কে আটক করে পিরোজপুর শহরের পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে পাঠানো হয়। সেখানে তাদের টানা তিন দিন ধরে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া পিরোজপুরের বিখ্যাত তালুকদার বাড়ি লুটপাটের পর ওই বাড়ি থেকে ২০-২৫ জন নারীকে ধরে এনে পাকিস্তানি সেনাদের কাছে হস্তান্তর করেন সাঈদী—এমন ভয়াবহ অভিযোগও ট্রাইব্যুনালের নথিতে অন্তর্ভুক্ত আছে। এসব নারীকে ক্যাম্পে আটকে রেখে দফায় দফায় ধর্ষণ করা হয়।

এই সমস্ত ঘটনায় উঠে এসেছে, ধর্মের পোশাকে নিজেকে আবৃত করে রাখা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ছিলেন এক ভয়ঙ্কর ও নৃশংস মানবতাবিরোধী অপরাধী, যিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে নারীদেহকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পিছপা হননি। বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব ঘটনাকে যথাযথভাবে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে—যেখানে শুধু একজন ব্যক্তির অপরাধ নয়, বরং একটি জাতির নারীদের ওপর চালানো নির্যাতনের প্রতিচ্ছবিও ফুটে উঠেছে।

 

রাজাকার [ Rajakar ]

 

সাঈদীর অপরাধ – জোরপূর্বক ধর্মান্তর:

দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নেতৃত্বে রাজাকার বাহিনী পিরোজপুর ও পারেরহাট অঞ্চলের হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর চালিয়েছিল পরিকল্পিত নির্যাতনের ভয়াবহতা। হিন্দুদের ঘরবাড়িতে হামলা চালিয়ে লুটপাট করা হতো, এরপর আগুন ধরিয়ে দেওয়া হতো সর্বস্বসহ বসতভিটা। এই ভয়ংকর নিপীড়নের মুখে অসংখ্য মানুষ প্রাণ বাঁচাতে পাড়ি জমান ভারতের শরণার্থী শিবিরে।

কিন্তু যারা যেতে পারেননি, তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল আরেকটি নির্যাতনের পথ—জোরপূর্বক ধর্মান্তর। অভিযোগে বলা হয়, সাঈদী ব্যক্তিগত প্রভাব ও ক্ষমতা ব্যবহার করে পারেরহাটসহ আশপাশের গ্রাম থেকে অন্তত ১০০ থেকে ১৫০ জন হিন্দুকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করেন।

তাদের জোর করে মসজিদে নিয়ে যাওয়া হতো, নামাজ পড়তে বাধ্য করা হতো, এবং দেওয়া হতো মুসলমান নাম। ধর্মান্তরের এই প্রক্রিয়ায় কারও মতামত বা সম্মতির কোনো সুযোগ ছিল না। এ ছিল এক ধরনের মানসিক নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক নিশ্চিহ্নকরণের ভয়াবহ প্রয়াস।

এই ঘটনাগুলো শুধু যুদ্ধাপরাধের উদাহরণই নয়, বরং তা এক জাতিগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টার জ্বলন্ত প্রমাণ। সাঈদীর নেতৃত্বে সংঘটিত এই ধর্মান্তর ছিল মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধগুলোর মধ্যে অন্যতম ঘৃণ্য অধ্যায়।

 

সাঈদীর অপরাধ – হত্যা-গণহত্যা, লুটপাট-অগ্নিসংযোগ:

১৯৭১ সালের ৪ মে সকালে, শান্তি কমিটির সদস্য সাঈদীর নেতৃত্বে মধ্য মাছিমপুর বাসস্ট্যান্ডের পেছনে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে জমায়েত হওয়া ২০ জন নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়।

একই দিনে মাছিমপুর হিন্দুপাড়ায়, পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তায়, ঘরবাড়িতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালানো হয়। পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করা অনেকের মধ্য থেকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে শরৎচন্দ্র মণ্ডল, বিজয় মিস্ত্রি, উপেন্দ্রনাথ, জগেন্দ্রনাথ মিস্ত্রি, সুরেন্দ্রনাথ মিস্ত্রি, মতিলাল মিস্ত্রি, জগেশ্বর মণ্ডল, সুরেশ মণ্ডলসহ আরও অন্তত ১৩ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে সাঈদী ও তার সহযোগীরা।

পরে তারা এলজিইডি অফিসের পেছনে ধোপাবাড়ি সংলগ্ন হিন্দুপাড়ায় গিয়ে দেবেন্দ্রনাথ মণ্ডল, জগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, পুলিন বিহারী ও মুকুন্দ বালাকে গুলি করে হত্যা করে।

এরপর তারা একে একে কালীবাড়ি, মাছিমপুর, পালপাড়া, শিকারপুর, রাজারহাট, কুকারপাড়া, ডুমুরতলা, কদমতলা, নবাবপুর, আলমকুঠি, ঢুকিগাতি, পারেরহাট ও চিংড়াখালী গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালিয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ ও লুটপাটের অংশ হিসেবে, অভিযোগ রয়েছে—সাঈদীর পরিকল্পনা, প্ররোচনা ও তৈরি করা তালিকা অনুযায়ী স্থানীয় বুদ্ধিজীবী, ছাত্রনেতা এবং সরকারি কর্মকর্তাদেরও হত্যা করা হয়। এর মধ্যে ছিলেন ছাত্রলীগ নেতা মিজানুর রহমান, স্কুল প্রধান শিক্ষক আব্দুল গাফফার মিয়া, সমাজসেবক শামসুল হক ফরাজী, অতুল কর্মকার, ইপিআর সদস্য সুবেদার আব্দুল আজিজ, এবং পারেরহাট বন্দরের ব্যবসায়ী গণপতি হালদার, কৃষ্ণকান্ত সাহা, বাণীকান্ত সিকদার ও তরণীকান্ত সিকদারসহ আরও অনেকে।

৭ মে, পাকিস্তানি সেনাদের স্বাগত জানান শান্তি কমিটির সদস্য সাঈদী। এ সময় তিনি আওয়ামী লীগ নেতা মাখনলাল সাহার দোকান থেকে ২২ সের সোনা-রূপা লুট করেন।

৮ মে, শহিদুল ইসলামের বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করেন। এরপর মানিক পশারীর বাড়িতে হানা দিয়ে মফিজ উদ্দিন ও ইব্রাহিম কুট্টিকে আটক করা হয়। ইব্রাহিমকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং মফিজ উদ্দিনকে নির্যাতনের জন্য রাজলক্ষ্মী হাইস্কুলের রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখান থেকে তিনি পরে পালিয়ে আসেন।

২ জুন, সাঈদীর নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনারা নলবুনিয়ার আবদুল হালিম বাবুলের বাড়িতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালায়। পরে উমেদপুর হিন্দুপাড়ায় ২৫টি ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয় এবং বিশা বালীকে হত্যা করা হয়।

পরে টেংরাখালী গ্রামে মাহবুবুল আলম হাওলাদারের বাড়িতে গিয়ে তার ভাইকে নির্যাতন করে, স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ অর্থ লুট করা হয়।

এক সময় নলবুনিয়া গ্রামের আজহার আলীর বাড়িতে গিয়ে আজহার ও তার ছেলে সাহেব আলীকে নির্যাতনের পর, সাহেব আলীকে পিরোজপুরে পাঠিয়ে হত্যা করা হয়।

জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে, মুক্তিযোদ্ধা মিজান তালুকদারের বাড়িতে হামলা করে তার বড় ভাইকে ধরে রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সাঈদী নিজ হাতে তাকে নির্যাতন করেন এবং মিজান তালুকদারের অবস্থান জানতে চান।

মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে, হোগলাবুনিয়া গ্রামের ১৪ জন হিন্দুকে ধরে এনে পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তায় হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

নভেম্বরের শেষ দিকে, যখন সাধারণ মানুষ ভারতে পালাচ্ছিল, তখন সাঈদীর নেতৃত্বে ১০-১২ জনের একটি দল ইন্দুরকানি গ্রামে তালুকদারদের বাড়িতে হামলা চালায়। ৮৫ জনকে আটক করা হয়, মালামাল কেড়ে নেওয়া হয় এবং পরে কিছু ঘুষ নিয়ে ছাড়া হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের ভাষ্যমতে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সাঈদী ‘পাঁচ তহবিল’ নামে একটি দলে নেতৃত্ব দেন, যার কাজ ছিল হিন্দু ও মুক্তিযুদ্ধে সহানুভূতিশীল মুসলমানদের ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি লুট করা। লুটকৃত সম্পদকে ‘গণিমতের মাল’ ঘোষণা করে তা নিজেরা ভোগ করতেন এবং বাজারে বিক্রি করতেন।

পারেরহাট বন্দরের হিন্দুদের ঘরবাড়ি নিজ হাতে লুট করতেন তিনি। মদন সাহার দোকানঘর পর্যন্ত ভেঙে এনে নিজের বাড়িতে বসিয়েছিলেন। বাজারের মনোহরি ও মুদি দোকান লুট করে নিজের দোকান খুলেছিলেন লঞ্চঘাটে। নিখিল পালের বাড়িও তুলে এনে পারেরহাট জামে মসজিদে ‘গণিমতের মাল’ হিসেবে ব্যবহার করেন। এমনকি শ্বশুরবাড়িতেও লুটের বাড়ি স্থাপন করেছিলেন তিনি।

আনোয়ার হোসেন, আবু মিয়া, নূরুল ইসলাম খান, বেনীমাধব সাহা, বিপদ সাহা প্রমুখের বাড়ি ও সম্পত্তিও সাঈদী লুট করেন।

রাজাকার [ Rajakar ]

 

দেইল্লা রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী!

রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, দেলোয়ার হোসেন শিকদার নামে পরিচিত এই ব্যক্তি পিরোজপুরে একসময় সাধারণ মানুষদের কাছে ‘দেইল্লা’ নামে পরিচিত ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন তার যুদ্ধাপরাধের জন্য এলাকার মানুষ তাকে ‘দেইল্লা রাজাকার’ নামেও ডাকত।

স্বাধীনতার পরে, ১৯ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে নিজের অপরাধের প্রমাণ ঢাকতে তিনি এক নাটকীয় পালানোর পথ বেছে নেন—বোরকা পরে গরুর গাড়িতে করে এলাকা ত্যাগ করেন। এরপর অস্ত্রসহ গিয়ে আশ্রয় নেন যশোরের মো. রওশন আলীর বাড়িতে। সেখান থেকে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। কিছু সময় পর তার যুদ্ধকালীন অপরাধের খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে তিনি পরিবার নিয়ে গা-ঢাকা দেন এবং স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে যান।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে, বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর তৈরি হওয়া প্রতিক্রিয়াশীল পরিবেশে, দেইল্লা আত্মগোপন অবস্থা থেকে প্রকাশ্যে আসেন। শুরু করেন মিথ্যা পরিচয়ে ওয়াজ মাহফিল।

নিজের পরিচয় বদলে ‘দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী’ নামে আত্মপ্রকাশ করেন এবং একপর্যায়ে হয়ে ওঠেন ‘আল্লামা মাওলানা’। এই পরিচয়েই তিনি ধর্মীয় নেতা হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করেন, অথচ রাষ্ট্রপক্ষের ভাষ্যে, এর সবই ছিলো একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ ঢাকার মোড়ক মাত্র।

এভাবেই ‘দেইল্লা রাজাকার’ পরিচয়ের কালিমা থেকে বের হয়ে তিনি ‘আল্লামা সাঈদী’ রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন—যা এক ঐতিহাসিক প্রতারণার বৃত্তান্ত হয়ে রয়ে গেছে।

১০ বছরে দাখিল পাস!

নিজেকে ‘আল্লামা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে দীর্ঘ পরিকল্পিত এক প্রতারণার ছায়া রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, এই যুদ্ধাপরাধী তার শিক্ষা সনদপত্র নিয়েও চরম জালিয়াতি করেছেন।

দাখিল সনদে তার নাম ছিল ‘মোস্তফা দেলাওয়ার হোসাইন’, আর আলিম সনদে তা রূপ নেয় ‘আবু নাঈম মো. দেলাওয়ার হোসাইন’-এ। সেখানেও রয়েছে বিস্ময়কর অসামঞ্জস্য: দাখিল সনদ অনুযায়ী তার জন্ম তারিখ ১৯৪৭ সালের ৩ মার্চ, অথচ সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে তিনি দাখিল পাস করেন ১৯৫৭ সালে। অর্থাৎ মাত্র ১০ বছর বয়সে পাবলিক পরীক্ষা পাস! যা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি অসঙ্গত এবং আইনবিরুদ্ধ।

এখানেই শেষ নয়। পরবর্তী সময়ে সনদপত্রে ঘষামাজা করে তার বয়স দাখিল পরীক্ষায় ১৬ বছর এবং আলিমে ১৯ বছর দেখানো হয়। এ ছাড়া তার আসল নাম পরিবর্তন করে ‘দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী’ নামে নতুন পরিচয় তৈরি করা হয়—যেটি এখন পরিচিত এক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নাম।

আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই তথ্যবিকৃতি এবং নাম-জন্মতারিখ সংশোধন করা হয়েছে পরীক্ষার ৪৮ ও ৫১ বছর পর! অথচ দেশের পাবলিক পরীক্ষার নিয়ম অনুযায়ী, পরীক্ষার্থী পাস করার দুই বছরের মধ্যে কেবল বয়স সংশোধন করা যায়। সাঈদী সেই নিয়ম ভেঙে প্রায় পাঁচ দশক পর এসব তথ্য পাল্টে ফেলেন।

২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সময় এসব জালিয়াতির বিষয় সামনে আসতে পারে বুঝতে পেরে, মাত্র ৪ ঘণ্টার মধ্যে, ১০ নভেম্বর ২০০৮ তারিখে মাদ্রাসা বোর্ড থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে সংশোধিত সনদপত্র সংগ্রহ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় বোর্ডের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও যুক্ত ছিলেন বলে বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে জানা যায়।

ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—তিনি আদৌ কখনো দাখিল পরীক্ষা দিয়েছেন কি না? ধারণা করা হচ্ছে, তখনকার দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণবিহীন মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার সুযোগ নিয়েই ১০ বছর বয়সে সনদ সংগ্রহ করেন তিনি, পরীক্ষা না দিয়েই।

এ প্রসঙ্গে ২০১২ সালের ১২ আগস্ট জাতীয় সংসদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির অধীনে একটি উপ-কমিটি গঠন করা হয়। তিন সদস্যের ওই কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন আব্দুল ওহাব, সদস্য ছিলেন মো. শাহ আলম ও বীরেন শিকদার। তদন্তে সহায়তা করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব গোলাম ফারুক ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ফাহিমা খাতুন।

দীর্ঘ তদন্ত শেষে, ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি উপ-কমিটি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সাঈদীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, সনদ বাতিল কিংবা মাদ্রাসা বোর্ডের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের শাস্তির সুপারিশ সেই প্রতিবেদনে করা হয়নি। ফলে প্রতিবেদনটি ফেরত পাঠানো হয় সংশোধনের জন্য।

এর আগেই বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে, শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে শিক্ষা সচিব মাদ্রাসা বোর্ড থেকে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র তলব করেন।

বর্তমানে এই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী আদালতের রায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছে। আর তার সেই “আল্লামা” পরিচয়ের আড়ালে এখন খোলাসা হয়েছে এক ভয়াবহ প্রতারণা ও ইতিহাস বিকৃতির চিত্র।

দেইল্লা রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী
দেইল্লা রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী

 

দেইল্লা রাজাকারের যত মিথ্যাচার আর ভাঁওতাবাজি!

বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘৃণা ও কলঙ্কের এক ভয়াবহ নাম দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী—যাকে জনগণ চেনে দেইল্লা রাজাকার নামে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একাধিক মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত এই ব্যক্তি পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন। তার নৃশংসতা ও বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস আজ আর কারও অজানা নয়।

তবে শুধু যুদ্ধাপরাধ নয়, দেইল্লা রাজাকার আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে বিচার ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার জন্য বিভিন্ন ধরণের চাতুর্য ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিল। একে একে তার সেইসব মিথ্যাচারের মুখোশ উন্মোচন করা প্রয়োজন।

নাম জালিয়াতির নাটক

সাঈদীর আইনজীবীরা আদালতে এমন কৌশল নেয় যাতে প্রমাণ করা যায়—যে ব্যক্তি ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত, তিনি আর বিচারাধীন ব্যক্তি দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী এক নন। তারা দাবি করে, অভিযুক্ত আসামির নাম ‘দেলু শিকদার’, আর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির নাম ‘দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী’—এই দুই ব্যক্তি নাকি আলাদা।

এমন বিভ্রান্তিকর প্রচারণার পর Education.net নামের একটি অনুসন্ধানী প্ল্যাটফর্ম তাদের বিস্তারিত তদন্তে সাঈদীর নাম ও বয়স জালিয়াতির আসল কাহিনি ফাঁস করে দেয়। তাদের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য, যা সাঈদীর মিথ্যাচার ও কৌশলী প্রতারণাকে নগ্ন করে দেয়।

বয়স সার্টিফিকেটে ভয়াবহ অসঙ্গতি

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাঈদী তার ভাষ্য অনুযায়ী দাখিল পাস করেন ১৯৫৭ সালে দারুস সুন্নাহ শশীনা মাদ্রাসা থেকে এবং ১৯৬০ সালে বরইপাড়া মাদ্রাসা থেকে আলিম পাস করেন। এই দুটি সনদপত্রে তার নাম ছিল ‘আবু নাঈম মোঃ দেলোয়ার হোসাইন’। জন্মতারিখ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন ১ জানুয়ারি ১৯৪৫।

এখন একটু হিসাব করি—যদি তার জন্ম ১৯৪৫ সালে হয়ে থাকে এবং দাখিল পাস করেন ১৯৫৭ সালে, তাহলে তিনি দাখিল পাস করেন মাত্র ১২ বছর বয়সে! এমন অসম্ভব একটি ঘটনা বিশ্বাসযোগ্য নয়, বিশেষ করে যখন দাখিল পর্যায়ের শিক্ষার জন্য নির্ধারিত বয়সসীমা ১৬ বছর ধরা হয়।

৫১ বছর পর নাম পরিবর্তনের অপচেষ্টা

শুধু নাম নয়, সার্টিফিকেট সংশোধনের ক্ষেত্রেও তার প্রতারণা স্পষ্ট। রিপোর্ট অনুযায়ী, সাঈদী ২০০৮ সালের ৫ নভেম্বর মাদ্রাসা বোর্ডে আবেদন করে তার দাখিল ও আলিম সনদের নাম পরিবর্তন করে “দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী” করতে চেয়েছিলেন। তখন তার দাখিল পাসের সময়ের পর ৫১ বছর এবং আলিম পাসের পর ৪৮ বছর কেটে গেছে! অথচ শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, পাসের পর মাত্র দুই বছরের মধ্যেই সংশোধনের আবেদন করা যায়।

চক্রান্তের উদ্দেশ্য ছিল পরিচয় মুছে ফেলা

এই সার্টিফিকেট জালিয়াতি এবং নাম পরিবর্তনের মূল উদ্দেশ্য ছিল আদালতের সামনে নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখা এবং ১৯৭১ সালের ঘৃণিত অপরাধ থেকে নিজেকে বাঁচানো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্য উদ্ঘাটিত হয়েছে, তার প্রতিটি কৌশল ধরা পড়েছে, এবং বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আমরা আবারও দেখতে পাই—কীভাবে একজন যুদ্ধাপরাধী শুধু ইতিহাস নয়, আদালত ও রাষ্ট্রকেও প্রতারিত করতে চেয়েছিল। দেইল্লা রাজাকারের মিথ্যাচার, ভাঁওতাবাজি ও অপকৌশল আমাদের চিরকাল মনে থাকবে এক ভয়ঙ্কর শিক্ষা হয়ে।

 

 

রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী 8 দেইল্লা রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী

 

আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, কোনো শিক্ষাগত সনদে যদি নাম বা বয়স সংশোধন করতে হয়, তা সংশ্লিষ্ট বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী পাশ করার মাত্র ২ বছরের মধ্যে করতে হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—সাঈদী কীভাবে সেই নিয়ম ভেঙে ৫১ বছর পর তার দাখিল ও আলিম সনদের নাম পরিবর্তন করতে সক্ষম হলো?

এই প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও তাকে সরাসরি করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি এর কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর দিতে পারেননি। কারণ, এটা ছিল পুরোপুরি এক চক্রান্ত, এবং সেই চক্রান্তে নির্দিষ্ট কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা ছিল।

উল্লেখযোগ্যভাবে, সেই সময় মাদ্রাসা বোর্ডের নাম ও বয়স সংশোধন কমিটিতে ছিলেন—

  • চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোঃ ইউসুফ (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত),

  • রেজিস্ট্রেশন শাখার দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক হাফিজুর রহমান (তিনিও এখন অবসরপ্রাপ্ত),

  • এবং বোর্ডের তৎকালীন নিয়ন্ত্রক ও বর্তমান চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুর নূর

এই নামগুলো এখানে উল্লেখ করার কারণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মোঃ আব্দুর নূর—বর্তমান চেয়ারম্যান—২০০৩ সালে যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর সুপারিশে পদোন্নতি লাভ করেছিলেন। এ থেকেই স্পষ্ট হয়, কতটা গভীর প্রভাব ও প্রভাবশালী সম্পর্ক ব্যবহার করে সাঈদী এই জালিয়াতি ও প্রতারণার কাজটি সম্পন্ন করেছিল।

আশা করি এখন বিষয়টি পরিষ্কার—দেইল্লা রাজাকার শুধু একজন যুদ্ধাপরাধীই নন, বরং একজন ঠাণ্ডা মাথার ষড়যন্ত্রী, যিনি পরিকল্পিতভাবে নাম ও বয়স জালিয়াতির মাধ্যমে আদালত ও জাতিকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্য চাপা থাকেনি।

দেইল্লা রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী 9 দেইল্লা রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী

 

দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় প্রকাশিত এক বিজ্ঞাপনে সাঈদী একটি হলফনামা (অ্যাফিডেভিট) তুলে ধরেন, যেখানে তিনি তার জন্মতারিখ দেখিয়েছেন ০১-০১-১৯৪৫। বিজ্ঞাপনটিতে সাঈদীর ভাষ্য ছিল:

“আমি দেলাওয়ার হুসাইন সাঈদী, জন্ম তারিখ ০১-০১-১৯৪৫, পিতা মাওলানা ইউসুফ সাঈদী, বাসা নং ৯১৪ শহীদবাগ, ঢাকা। আমি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক। পূর্ব পাকিস্তান মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড (বর্তমানে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড)-এর অধীনে দাখিল পাশ করি ১৯৫৭ সালে, রোল নং ৩৯২০, কেন্দ্র সারসিন, প্রথম বিভাগে। আলিম পাশ করি ১৯৬০ সালে, রোল নং ১৭৬০, খুলনা বিভাগ, তৃতীয় বিভাগে। উভয় পরীক্ষায় আমার নাম ভুলক্রমে ‘আবু নাঈম মোহাম্মদ দেলাওয়ার হুসাইন’ হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়, যা প্রকৃতপক্ষে হওয়া উচিত ‘দেলাওয়ার হুসাইন সাঈদী’। আমি এ বিষয়ে ৫ নভেম্বর ২০০৮ সালে নোটারী পাবলিক, ঢাকায় উপস্থিত হয়ে হলফ করি।”

এই বিজ্ঞাপন ও হলফনামা ভালোভাবে পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে—সাঈদী ২০০৮ সালে শুধুমাত্র নামই নয়, নিজের বয়সও পরিবর্তন করেন।

এখন একটু হিসেব করি—যদি তার জন্ম হয় ১৯৪৫ সালে, তবে দাখিল পাশের সময় (১৯৫৭) তার বয়স দাঁড়ায় মাত্র ১২ বছর। অথচ সে সময় ১২ বছর বয়সে দাখিল পরীক্ষায় বসা আইনত বা বাস্তবতায় সম্ভব ছিল না। তাহলে সাঈদী কীভাবে এমন অসম্ভব ঘটনাকে সম্ভব করে তুললেন?

উত্তর সহজ—তিনি জালিয়াতি করেন।

সাঈদী অত্যন্ত কৌশলে ২০০৮ সালে নয়, ২০০৫ সালের ৮ নভেম্বরই প্রথমবার বয়স পরিবর্তনের কাজটি করেন। কিন্তু পুরনো প্রবাদে যেমন বলা হয়—“চোরের দশ দিন, গৃহস্থের এক দিন”—এই ধূর্ততা ধরা পড়ে যায়।

আরেকটি গুরুতর আইন লঙ্ঘনও এখানে ঘটে। বয়স সংশোধন করতে গেলে, যার বয়স সংশোধন করা হচ্ছে তার পিতা বা মাতার জীবিত অবস্থায় তাঁদের মাধ্যমেই এফিডেবিট করতে হয়। অথচ ২০০৮ সালে সাঈদীর মা জীবিত থাকা সত্ত্বেও এই দেইল্লা রাজাকার নিজেই হলফনামায় স্বাক্ষর করে, যা আইনত সম্পূর্ণ অবৈধ ও বাতিলযোগ্য

এই এফিডেবিটে তার নিজের স্বাক্ষর রয়েছে, যা নিচের ছবিতে স্পষ্ট দেখা যায়।

দেইল্লা রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী 10 দেইল্লা রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী

 

দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় প্রকাশিত সাঈদীর একটি বিজ্ঞাপনে তার বয়স ০১-০১-১৯৪৫ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ দিচ্ছি: ২০০৮ সালের ৮ নভেম্বর সাঈদী নিজের স্বাক্ষরে ‘দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী’ নাম ব্যবহার করলেও, নির্বাচনের প্রত্যয়ন পত্রে মাত্র ২২ দিনের মধ্যে তিনি নিজের স্বাক্ষর বদলে দেন ‘মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী’ হিসেবে।

এখানে সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়টি লক্ষ্য করুন—সাঈদীর সকল অফিসিয়াল সার্টিফিকেটে জন্মসাল ১৯৪৫ হলেও, নির্বাচনের সময় তার জন্মসাল হঠাৎ করে ১৯৪০ হয়ে যায়!

এটাই স্পষ্ট করে দেয় কতটা সুচতুর ও মস্করা ছলাকার তিনি, যিনি নিজের পরিচয় ও বয়সকে ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করে নিজেদের কৌশল চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

দেইল্লা রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী 11 দেইল্লা রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী

 

এবার একটু সাঈদীর শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি উন্মোচন করি। মোটের উপর সাঈদীর পড়াশোনা আলিম পাস পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। তবু, ওই বদমাইশ ব্যক্তি নিজেকে ‘আল্লামা’ বলে ডেকেছে।

আপনি যদি সাধারণ বুদ্ধি সম্পন্ন হন, তাহলে স্বাভাবিকই প্রশ্ন উঠবে—সাঈদী কি মাত্র আলিম পাস করে ‘আল্লামা’ খেতাব ধারন করার অধিকার রাখে?

২০০৮ সালের নির্বাচনের প্রত্যয়ন পত্রেও তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, তার সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা হলো আলিম পাস, যা ইন্টারমিডিয়েটের সমতুল্য।

যে ব্যক্তির সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা মাত্র আলিম পাস, সে কীভাবে এই ‘আল্লামা’ উপাধি ব্যবহার করতে পারে?

এই বিষয়টি তার বিরুদ্ধে আসা রায়ের ৮ নম্বর পাতায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। নিচে রায়ের ওই অংশ ও নির্বাচনের প্রত্যয়ন পত্রের ছবি দেওয়া হলো, দেখে আপনি নিজেই মিলিয়ে নিতে পারবেন।

 

 

রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী 12 দেইল্লা রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী

 

অর্থের মিথ্যা হিসাব নিয়ে একটু কথা বলি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে সাঈদী নির্বাচন কমিশনকে যে আয়-ব্যয়ের হিসাব দেখিয়েছিলেন, সেটার সাথে তার প্রকৃত আয়-ব্যয়ের কোনও মিল ছিল না। বাংলা লিক্স থেকে ফাঁস হওয়া সাঈদীর ফোনালাপের কথাবার্তার সঙ্গে তাঁর প্রদত্ত আয়-ব্যয়ের তথ্যও পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। আয়কর দফতরের কাগজে দেখা গেছে, সাঈদীর ব্যাঙ্কে জমাকৃত টাকার পরিমাণ ছিল মাত্র ৬ লাখ ৯ হাজার ৮০৪ টাকা।

কিন্তু সেই ফোনালাপে, যেখানে সাঈদী তার আইনজীবীর সঙ্গে আব্দুর রাজ্জাকের কথা বলছিলেন, সেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন ব্যাংকে কয়েকশো কোটি টাকা জমা আছে—যা নির্বাচনের সময় সুচতুর এই ডান্ডাবাজি করে গোপন রাখা হয়।

নির্বাচনের সময় জমা দেওয়া কাগজপত্রে তার সম্পদের পরিমাণ মোটামুটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৭৫৭ টাকা দেখানো হয়েছে। তাহলে এই কয়েক বছরের মধ্যে এত বিশাল সম্পদের মালিক তিনি কীভাবে হলেন? আর এত বিশাল টাকাও ব্যাংকে কীভাবে এসে জমা হলো? প্রশ্নগুলো আজও অনসুলভ।

 

দেইল্লা রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী 13 দেইল্লা রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী

 

এত কথা গেল দেশের, এবার বিদেশে এই বদমাইশ কিভাবে গিয়েছিল, তার একটা সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিই। ইংল্যান্ডের একটি পত্রিকা তাকে ‘জানোয়ার’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই নরঘাতক, লম্পট রাজাকার শুধু দেশে নয়, বিদেশেও অপরাধের জাল বিছিয়েছিল।

২০০৬ সালে সে ইংল্যান্ডে গিয়ে বেশ কালো ছাপ ফেলে গেছে। ধর্মকে ব্যবসার ফাঁদ বানিয়ে শুধু ইসলাম নয়, ইংল্যান্ডে প্রচলিত খ্রিস্টধর্মকেও অপমান করেছে। সে বলে বসেছিল, ইংল্যান্ড আর আমেরিকায় যে বোমা হামলা হয়, তা ‘উচিত’ কাজ। তার মতে, ইংল্যান্ডের লোকেরা বোমা খাওয়াই উচিৎ এবং আরও বেশি বোমা মারা উচিত।

ইংল্যান্ডে বসে এমন জঙ্গিবাদী উস্কানি দেওয়া কোনোভাবেই সহ্য করা যায় না। এই শয়তান সরাসরি মানুষকে জঙ্গিবাদে প্ররোচিত করছিল। তখন ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ট্যাবলয়েড ‘The Sun’ ২০০৬ সালের ৫ জুলাই একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, শিরোনাম ছিল — “Ban this beast and Kill Brits Hate Cleric let into UK”। এখানে সাঈদীকে ‘জানোয়ার’ বলে অভিহিত করা হয়। ফেসবুক বা টুইটারে ওই সময়কার ব্রিটিশ পাঠকদের প্রতিক্রিয়া খুঁজলে এর প্রমাণ মেলে।

প্রথমবার ব্রিটিশ সরকার সাঈদীকে দেশে ঢুকতে দেওয়ার পরও, ২০০৬ সালে লন্ডনে এসে আবার ইংল্যান্ড ও আমেরিকাকে কটুক্তি করে, তারা বোমা হামলার যোগ্য—এমন অসভ্য মন্তব্য করলে তখন ইংল্যান্ডের মিডিয়া তার ভিসা বাতিলের দাবি তোলে। আজ সাঈদীকে ইংল্যান্ড, আমেরিকা ও কানাডায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

 

রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী 15 দেইল্লা রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী

 

ব্লগার আমি যাত্রীর এক লেখায় জানা যায়, ১৯৯৭ সালের ২৬ অক্টোবর দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেখানে রাজাকার সাঈদী দাবি করেছিলেন, “তিনি রাজাকার ছিলেন—এটা কেউ প্রমাণ করতে পারবে না।”

এর উত্তরে পিরোজপুরের চারটি এলাকার মানুষ স্পষ্টভাবে বলেছে, “সাঈদী ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর রাজাকার।” তারা আরও জানিয়েছে, এই দেশ থেকে সকল রাজাকার যুদ্ধাপরাধীর বিচার হওয়া অবশ্যম্ভাবী। পাপ কখনোই বেঁচে থাকেনা।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার ব্যবস্থার প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে এবং এই নরঘাতকের ফাঁসি নিশ্চিতভাবেই হবে।

 

দেইল্লা রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী 14 দেইল্লা রাজাকার থেকে আল্লামা সাঈদী

 

সুত্রঃ

  1. আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
  2. এডুকেশন ডট নেট
  3. দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকা
  4. The Sun, England newspaper

Leave a Comment