জিলাইভ২৪.কম রিপোর্ট
গৌতম শান্তিলাল আদানি । গৌতম আদানি নামেই তিনি পুরো ভারত তো বটেই বিশ্বজুড়েও পরিচিত। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তাকে নিয়ে চলছে আলোচনা সমালোচনা ও নিন্দার ঝড়। এর কারন হলো তার বিশাল সম্পদের সাম্রাজ্যে রাতরাতি ধ্বস নেমে আসা।
বিশ্বখ্যাত অর্থনীতি বিষয়ক ম্যাগাজিন ফোর্বস এর শীর্ষ ধনীর তালিকায় বিশ্বে ৩য় স্হান থেকে পতন হয়ে ফেব্রুয়ারি ২০ তারিখে তার অবস্হান ২৪ তম স্হানে নেমে আসে।
বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের তালিকায় ৩য় থেকে ধ্বসে পড়ে এখন ২৬ তম স্হানে

গত ২০২২ সালের আগস্টে প্রকাশিত ব্লুমবার্গ বিলিওনেয়ার ইন্ডেক্স অনুযায়ী, তার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিলো ১৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যার অর্ধেক খুইয়েছে আদানী গ্রুপ।
গত ২৪ জানুয়ারী ২০২৩ সালে মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিনডেনবার্গ এক প্রতিবেদনে অভিযোগ করে, আদানি গ্রুপ স্টক ও হিসাবের বিষয়ে জালিয়াতি করে সম্পদের পরিমাণ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়েছে। গত এক দশক ধরে আদানি গ্রুপ এই জালিয়াতি করছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যদিও ইতোমধ্যে, ভারতীয় বিজনিস তাইকুন আদানির বিশ্বব্যাপী ঈর্ষনীয় ব্যবসা সম্প্রসারনকে স্ব-প্রনোদিত আক্রমন করে শেয়ার দরের পতন ঘটিয়ে সেখান থেকে ফায়দা লুটের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ান গবেষক ও ইইএনএসডব্লিও এর এসোসিয়েট প্রফেসর মার্ক হামফেরি-জেনার ‘দ্যা কনভারসেশন’ এ প্রকাশিত “সর্ট সেলিং আদানি:হাউ আ্যান অবসকিওর ইউএস ফার্ম প্রফিটেড ফ্রম ট্রিগারিং দ্যা ইনডিয়ান জায়ান্ট’স প্রাইস প্লান্জ” নিবন্ধে হিনডেনবার্গ কে সর্ট সেলিং এর মাধ্যমে নিজেদের মূনাফা অর্জনের জন্য দায়ী করেছে।
হিনডেনবার্গ মূলত কর্পোরেট জালিয়াতি ও গোপনীয়তার সাথে হিসেব নিকেশের মারপ্যাচে চোখে ধুলো দেওয়ার মতো ঘটনাগুলি ফাঁস করে থাকে। এর আগে নিকোলা, ক্লোভার হেলথ, কান্ডি, লর্ডসটাউন মোটরস এবং টেকনোগ্লাসের মতো সংস্থার শেয়ার জালিয়াতির রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল তারা। নিকোলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় শেয়ার জালিয়াতির ঘটনা। ২০২০ সালে নিকোলার রিপোর্ট প্রকাশের পরপরই সংস্থার আসল ছবি উঠে আসে। কার্যত বিনা ব্যবসাতেই হাজার হাজার কোটি টাকার শেয়ার দর দাঁড় করিয়েছিল নিকোলা। হিন্ডেনবার্গের রিপোর্টে তা জানাজানি হতেই বিপুল পতন হয় নিকোলার শেয়ারে। ফাঁস হয় নিকোলার মিথ্যা ব্যবসা। বর্তমানে কার্যত কোনও পাত্তাই নেই নিকোলার।
গত বছর পুরো এশিয়ায় চীনের জ্যাক মা ও ভারতের আম্বানী কে পিছনে ফেলে আদানি বিশ্বে শীর্ষ ধনীর তালিকায় ৩য় স্থানে উঠে আসে।
বাংলাদেশে কি কি ব্যবসা রয়েছে আদানির?

১৯৬২ সালের ২৪জুন ভারতের গুজরাটে আহমেদাবাদে জন্ম গৌতম আদানী পিতা শান্তিলাল আদানির টেক্সটাইল ব্যবসায় মনযোগ ছিলোনা কখনও। পড়াশুনাও এগোয়নি।
কিশোর বয়সে ১৯৭৮ সালে গুজরাট থেকে মুম্বাইয়ে চলে আসেন হীরের ব্যবসা করার জন্য। সাফল্যও পেয়ে যান স্বল্প সময়ে। এরপর ১৯৮১ সালে বড় ভাই মহাসুখবাই আদানির সাথে যোগ দেন পলিভিনাইল ক্লোরাইড বা পিভিসি আমদানীর ব্যবসায়। ১৯৮৮ সালে আদানি এক্সপোর্টস নামে ব্যবসা নিবন্ধন করেন শুরু করেন পলিমার কারখানা। এই আদানি এক্সপোর্টস ই এখন আদানি গ্রুপের হোল্ডিং কোম্পানি। কেমিক্যাল, খাদ্য ও কৃষিপণ্য, ভোজ্যতেল, টেক্সটাইল, স্টিল বা মেটাল ইন্ডাস্ট্রি, সমূদ্র ও বিমান বন্দর ম্যানেজমেন্ট ও বিদ্যুৎ খাতে আদানির বিনিয়োগ রয়েছে।
১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে আদানির ব্যবসা শুরু হয় ভোজ্যতেল শোধন ও বাজারজাতকরন দিয়ে।

সিঙ্গাপুরের উইলমার ইন্টারন্যাশনাল ও ভারতের আদানি গ্রুপের যৌথ কোম্পানি বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেড (বিইওএল) রূপচাঁদা, ফরচুন, কিংস, মিজান ও ভিওলা ব্র্যান্ড নামে ভোজ্যতেল বিক্রি করে।
চলতি বছরের মার্চ থেকে গরমের সময় বাংলাদেশের সরবরাহ ঠিক রাখতে সরকার ভারতের ঝাড়খন্ডে অবস্থিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আমদানীর চুক্তি রয়েছে।
এ চুক্তি নিয়ে পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড একটি রিভিউ চেয়েছে। ট্টান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও আদানির বিদ্যুৎ এ অতিরিক্ত মূল্য ধরার অভিযোগ করে স্বাক্ষরিত চুক্তি বাতিলের দাবী জানিয়েছে।

এর বাইরে আদানি বাংলাদেশে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও টার্মিনাল পরিচালনা, বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে ভোজ্যতেলসহ কৃষি প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্য তৈরির একটি শিল্পপার্ক করার পরিকল্পনা করেছে। এ জন্য শিল্পনগরের মধ্যেই পৃথক ১০০ একর জায়গা নির্দিষ্ট করা হয়েছে তিন বছর আগে। কিন্ত সেখানে জেটি ও সড়ক না থাকায় কার্যক্রম এগোয়নি।
এ ছাড়া সরকারি প্রকল্পের জন্য বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও বিতরণ খাত ও বেসরকারি পর্যায়ে কয়লা, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ রয়েছে তাদের।
এসব বিষয়ে বাংলাদেশের যথাযথ কতৃপক্ষের সাথে আলোচনা যখন অগ্রগতি হচ্ছিল ঠিক তখনই আদানির সুবিশাল সম্পদের সাম্রাজ্যে ধ্বস নেমে আসে।
