বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সাংবাদিকতা ও শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণের ইতিহাসে ফজলুল হক এক উজ্জ্বল অগ্রপথিক। চলচ্চিত্রকে তিনি কখনো নিছক বাণিজ্যিক বিনোদনের উপাদান মনে করেননি, বরং একে বিবেচনা করেছেন শিল্প, সংস্কৃতি, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক বোধ জাগ্রত করার শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে। সাংবাদিকতা, পত্রিকা সম্পাদনা এবং চলচ্চিত্র পরিচালনা—তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ধারায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক পদচারণা তৎকালীন সংস্কৃতিচর্চায় এক অভূতপূর্ব মাত্রা যোগ করেছিল।
১৯৩০ সালের ২৬ মে বগুড়ার মালতীনগরের এক বনেদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ফজলুল হক। শৈশব থেকেই সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর অনুরাগের সূচনা ঘটে। এমন এক সময়ে তিনি চলচ্চিত্র সাংবাদিকতায় নামেন, যখন এ দেশে সিনেমা নিয়ে মননশীল লেখালেখি কিংবা বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনার সুযোগ ছিল একেবারেই সীমিত। তাঁর দূরদর্শিতা ও একনিষ্ঠ চেষ্টার ফলেই রূপালী জগতকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক রুচিবোধ ও চিন্তাশীল আলোচনার সৃষ্টি হয়।
উপমহাদেশে বাংলা ভাষায় চলচ্চিত্রবিষয়ক সাময়িকী প্রকাশের ধারায় তাঁর ভূমিকা ছিল যুগান্তকারী। তাঁর সম্পাদিত ও প্রকাশিত বিখ্যাত ‘সিনেমা’ পত্রিকা দেশীয় চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার ইতিহাসের এক অনন্য মাইলফলক। কেবল সাধারণ বিনোদনের খবর পরিবেশন নয়, বরং চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা, প্রযুক্তিগত নির্মাণশৈলী এবং শিল্পমূল্য নিয়ে নিবিড় আলোচনার পথ তৈরি করেছিল এই সাময়িকী।
সাংবাদিকতার গণ্ডি পেরিয়ে চলচ্চিত্র পরিচালনায় এসেও নিজের সৃজনশীলতার গভীর ছাপ রাখেন ফজলুল হক। তাঁর নির্দেশনায় নির্মিত ‘প্রেসিডেন্ট’ বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র হিসেবে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। শিশুদের মনস্তত্ত্ব, কল্পনা ও মানবিক বোধের বিকাশকে বড় পর্দায় তুলে ধরার এই প্রয়াস ছিল সময়ের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবমুখী ও আধুনিক। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিশুদের জন্য সুনির্মিত চলচ্চিত্র তাদের মনন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
একদিকে বস্তুনিষ্ঠ লেখালেখি এবং অন্যদিকে সরাসরি চিত্রপরিচালনা—এই দুইয়ের সমন্বয়ে তিনি চলচ্চিত্র অঙ্গনে নিজের একটি পৃথক পরিচয় গড়ে তোলেন। ১৯৯০ সালের ২৬ অক্টোবর মাত্র ষাট বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু মৃত্যুর পরও তাঁর কাজের উত্তরাধিকার মুছে যায়নি।
তাঁর স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে ২০০৪ সালে তাঁর সহধর্মিণী, প্রখ্যাত কথাশিল্পী রাবেয়া খাতুন প্রবর্তন করেন ‘ফজলুল হক স্মৃতি পুরস্কার’। প্রতিবছর চলচ্চিত্র সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্র পরিচালনায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ পুরস্কার প্রদান করা হয়।
ফজলুল হকের স্মৃতি রক্ষায় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) তাদের একটি মিলনায়তনের নামকরণ করেছে ‘ফজলুল হক স্মৃতি মিলনায়তন’। এছাড়া তাঁর পারিবারিক উত্তরাধিকারও দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে উজ্জ্বল হয়ে আছে। তাঁর পুত্র ফরিদুর রেজা সাগর চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিশিষ্ট সংস্কৃতিজন এবং কন্যা কেকা ফেরদৌসী দেশের প্রখ্যাত রন্ধনশিল্পী ও প্রথিতযশা টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব। ফজলুল হকের চিন্তা ও সৃজনশীলতার আলো আজ এতদিন পরও বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যম ও চলচ্চিত্র অঙ্গনে একইভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।
এ বি এম জাকিরুল হক টিটন একজন বাংলাদেশী সাংবাদিক, কলামিস্ট, লেখক, সম্পাদক এবং রাজনৈতিক কর্মী। বগুড়া জেলার সন্তান টিটন তাঁর ছাত্রজীবনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) পরপর দুবার নির্বাচিত পত্রিকা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পেশাগত জীবনে তিনি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘পূর্বপশ্চিমবিডি ডট নিউজ’-এর সম্পাদক এবং ‘জিলাইভ’ ও ‘দৈনিক খবরওয়ালা’ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। টিটন সম্পাদনার পাশাপাশি সমসাময়িক নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়াবলী নিয়ে নিয়মিত কলাম ও নিবন্ধ লিখে থাকেন।









