ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে নাদিয়া বেগম নামে তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। শ্বশুরবাড়ি থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর থেকে স্বামী কাওছার মিয়া ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, যৌতুক কিংবা পারিবারিক বিরোধের জেরে নাদিয়াকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) রাতে উপজেলার গফরগাঁও ইউনিয়নের হাতিখলা গ্রাম থেকে নাদিয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি উপজেলার লংগাইর ইউনিয়নের বাগবাড়ি গ্রামের নাজিম উদ্দিনের মেয়ে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক বছর আগে হাতিখলা গ্রামের নূর চানের ছেলে কাওছার মিয়ার সঙ্গে পারিবারিকভাবে নাদিয়ার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই স্বামীর বাড়িতে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছিলেন তিনি। পরিবারের অভিযোগ, শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাঁকে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন।
নির্যাতনের বিষয়টি একাধিকবার মা-বাবাকে জানিয়েছিলেন নাদিয়া। তবে মেয়ের সংসার টিকিয়ে রাখার কথা ভেবে তাঁরা তাঁকে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিতেন। শেষ পর্যন্ত মেয়ের এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না স্বজনেরা।
নিহত নাদিয়ার মা ময়ফুল বানু জানান, বুধবার দুপুরেও মেয়ের সঙ্গে তাঁর মুঠোফোনে কথা হয়েছিল। ওই সময় নাদিয়া জানিয়েছিলেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি বাবার বাড়িতে আসবেন। কিন্তু সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হলেও মেয়ে আর বাড়িতে ফেরেননি।
রাত ৮টার দিকে কাওছার মিয়ার এক আত্মীয় ফোন করে নাদিয়ার মৃত্যুর খবর জানান। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা দ্রুত হাতিখলা গ্রামে ছুটে যান। রাত ৯টার দিকে শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে তাঁরা নাদিয়ার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন।
ময়ফুল বানু বলেন, ‘বুধবার দুপুরে নাদিয়া ফোন করে আমাকে জানিয়েছিল, সে কিছুক্ষণ পর আমাদের বাড়িতে আসবে। রাত ৮টার দিকে জামাই কাওছারের এক আত্মীয় ফোন করে নাদিয়া মারা গেছে বলে খবর দেয়। রাত ৯টার দিকে আমরা গিয়ে শ্বশুরবাড়িতে নাদিয়ার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখি।’
তিনি জানান, সেখানে অনেক মানুষের ভিড় থাকলেও নাদিয়ার স্বামী কিংবা শ্বশুরবাড়ির পরিবারের কোনো সদস্যকে পাওয়া যায়নি। তাঁদের এভাবে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি পরিবারের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ তুলে ময়ফুল বানু বলেন, ‘আমার মেয়ে তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। তাকে যদি হত্যাই না করা হয়ে থাকে, তবে মেয়ে জামাইসহ বাড়ির অন্য সবাই কেন মরদেহ ফেলে পালিয়ে গেল? আমরা এই হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার চাই।’
এদিকে নাদিয়ার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যার অভিযোগ তোলা হলেও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন গফরগাঁও থানার পরিদর্শক মশিউর রহমান। তিনি জানান, খবর পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, নাদিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর মা ময়ফুল বেগম বাদী হয়ে গফরগাঁও থানায় অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে ঘটনার পর থেকে অনুপস্থিত স্বামী কাওছার মিয়া ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
নাদিয়ার পরিবারের সদস্যরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।









