,

সৌদি আরবের নিরাপত্তায় যুদ্ধবিমান মোতায়েনের সিদ্ধান্ত যুক্তরাজ্যের

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে সৌদি আরবকে সুরক্ষা দিতে টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ শহর, বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করতে এই সামরিক সহায়তা দেওয়া হবে। তবে ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, যুদ্ধবিমানগুলো কেবল প্রতিরক্ষামূলক অভিযানে অংশ নেবে। হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো হামলা চালাতে এগুলো ব্যবহার করা হবে না।

মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (আরএএফ) টাইফুন যুদ্ধবিমান সৌদি আরবের আকাশসীমায় প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এর মূল উদ্দেশ্য হবে হুতিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন থেকে দেশটির জনবহুল এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করা।

ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এই যুদ্ধবিমান মোতায়েনের অর্থ ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো সামরিক অভিযান শুরু করা নয়। বরং সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে যুক্তরাজ্যের বিদ্যমান সহযোগিতার অংশ হিসেবেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধবিমান মোতায়েনের পাশাপাশি সৌদি আরবকে দেওয়া আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহসংক্রান্ত সামরিক সহায়তার মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সৌদি যুদ্ধবিমানগুলো আকাশে অবস্থানরত অবস্থায় অন্য বিমান থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবে। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী দীর্ঘ সময় আকাশে অবস্থান করে প্রতিরক্ষামূলক অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

সম্প্রতি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ এবং দেশটির উপকূলবর্তী গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হুতিদের একাধিক হামলার পর ব্রিটিশ সরকার নতুন এই সামরিক সহায়তার ঘোষণা দিল।

সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে দেশটির বিমানবন্দরগুলোতে হুতিদের হামলায় অন্তত ১৯ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গত ১০ অক্টোবর রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন প্রাণ হারান এবং আহত হন আরও ৩০৮ জন।

সৌদি আরবে এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটিকে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক স্থাপনায় এত বড় প্রাণহানির ঘটনা দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ায় সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। বিমানবন্দর ছাড়াও জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা দেশটির জন্য বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে ইয়েমেনে দীর্ঘদিন ধরে চলমান গৃহযুদ্ধের অন্যতম প্রধান পক্ষ হুতি বিদ্রোহীরা। দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বিরুদ্ধে তারা সশস্ত্র সংঘাতে জড়িত রয়েছে। সৌদি আরব ওই সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে। অন্যদিকে রাজধানী সানাসহ ইয়েমেনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

হুতিদের দাবি, ইয়েমেনে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালানো হচ্ছে। ফলে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের প্রভাব প্রতিবেশী সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও পড়ছে।

সৌদি আরবে হুতিদের ধারাবাহিক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং। তিনি বলেন, বন্ধুপ্রতিম সৌদি আরবের ওপর হুতিদের বারবার হামলা অত্যন্ত নিন্দনীয়। বিশেষ করে রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার ঘটনা থেকে বোঝা যায়, আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে হুতিরা কতটা আগ্রাসী অবস্থান নিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ব্রিটিশ সামরিক সহায়তার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আরএএফ টাইফুন যুদ্ধবিমানগুলো সৌদি আকাশসীমায় প্রতিরক্ষামূলক অভিযান পরিচালনা করবে এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় সহায়তা করবে।

ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবকে হুতিদের আকাশপথের হামলা থেকে রক্ষা করতে দেশটিতে আগে থেকেই ব্রিটিশ সামরিক সরঞ্জাম ও জনবল মোতায়েন রয়েছে। নতুন যুদ্ধবিমান পাঠানোর সিদ্ধান্ত সেই চলমান সহযোগিতারই সম্প্রসারণ।

এদিকে যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি পরিস্থিতিও সরকারের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। দেশটিতে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকায় জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

লন্ডন থেকে সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার সাংবাদিক ক্যামিল নেদেলেক জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্যে জ্বালানির ক্রমবর্ধমান মূল্য নিয়ে ব্রিটিশ সরকার উদ্বিগ্ন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই উদ্বেগও সৌদি আরবের নিরাপত্তায় অতিরিক্ত সামরিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশ সৌদি আরব। দেশটির জ্বালানি উৎপাদন ও রপ্তানিসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এসব স্থাপনায় হামলা বা উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে।

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ বাড়াতে পারে। ফলে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে রক্ষার বিষয়টি দেশটির নিজস্ব নিরাপত্তার পাশাপাশি বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার করতে যুক্তরাজ্যের টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েনের সিদ্ধান্ত দুই দেশের সামরিক সহযোগিতায় নতুন মাত্রা যোগ করছে। তবে ব্রিটিশ সরকার স্পষ্ট করেছে, এই উদ্যোগের লক্ষ্য সৌদি আরবের শহর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণাত্মক অভিযানে অংশ নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা এই ঘোষণার অন্তর্ভুক্ত নয়।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।