,

স্মরণ – ফাদার মারিনো রিগন, বাংলাদেশের অকৃত্রিম হিতৈষী ও মানবতার আলোকবর্তিকা

কিছু মানুষ জন্ম নেন এক দেশে, অথচ তাঁদের ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়ে অন্য দেশের মানুষের মধ্যে। মানবসেবা, শিক্ষা বিস্তার, আত্মত্যাগ ও মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ দিয়ে তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি জাতির আপনজন। ফাদার মারিনো রিগন ছিলেন তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব। ইতালিতে জন্ম নেওয়া এই খ্রিষ্টধর্মযাজক জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন বাংলাদেশে। এ দেশের মানুষের শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের দুঃসময়ে তাঁর মানবিক অবস্থান তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় করে রেখেছে।

ফাদার মারিনো রিগন কেবল একজন ধর্মযাজক ছিলেন না; তিনি ছিলেন শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক এবং বাংলাদেশের অকৃত্রিম বিদেশি বন্ধু। নিজের জন্মভূমির বাইরে এসে একটি দেশের মানুষের কল্যাণে জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করার মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, মানবতার সম্পর্ক জাতীয়তা কিংবা ভৌগোলিক সীমারেখায় আটকে থাকে না। বাংলাদেশের মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল গভীর ও আন্তরিক। সেই ভালোবাসার টানেই জীবনের শেষ ইচ্ছা হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন এ দেশের মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

ইতালিতে জন্ম ও শৈশব

ফাদার মারিনো রিগনের জন্ম ১৯২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ইতালির ভেনেতো অঞ্চলের ভিসেঞ্জা প্রদেশের ভিল্লাভেরলা গ্রামে। তাঁর বাবা রিকার্ডো রিগন ছিলেন ইতালির একটি নাট্যদলের অভিজ্ঞ ও জনপ্রিয় অভিনেতা। মা মনিকা জোক্কে পেশায় ছিলেন স্কুলশিক্ষিকা। পরিবারে সংস্কৃতি ও শিক্ষার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের পরিবেশ তাঁর মানসিকতা গঠনে ভূমিকা রেখেছিল।

ধর্মীয় আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে রিগন মানুষের সেবা ও কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার পথ বেছে নেন। ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসেন। তখন হয়তো কেউ কল্পনাও করতে পারেননি, ইতালি থেকে আসা এই ধর্মযাজক একদিন বাংলাদেশের মানুষের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে যাবেন যে এ দেশই হয়ে উঠবে তাঁর আপন ঠিকানা।

বাংলাদেশে আসার পর ধীরে ধীরে এ দেশের মানুষ, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা, শিক্ষার সীমিত সুযোগ এবং সামাজিক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। সময়ের সঙ্গে তাঁর কর্মকাণ্ডের পরিধিও বিস্তৃত হয়। মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের প্রচেষ্টা হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

দক্ষিণাঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে অবদান

বাংলাদেশে ফাদার রিগনের কর্মজীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার শেহলাবুনিয়া গ্রামে। প্রায় ৬৩ বছর ধরে তিনি এ দেশের মানুষের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই দীর্ঘ সময়ে শিক্ষা বিস্তার, সমাজকল্যাণ এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

দক্ষিণাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিশু-কিশোরদের শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে তিনি ১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাঁর এই উদ্যোগ ছিল কেবল বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের জীবন পরিবর্তনের একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রয়াস।

শিক্ষাকে তিনি দেখতেন দারিদ্র্য, অজ্ঞতা ও সামাজিক পশ্চাৎপদতা কাটিয়ে ওঠার অন্যতম কার্যকর উপায় হিসেবে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, শিক্ষা মানুষের চিন্তাশক্তি বিকশিত করে, আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সক্ষমতা তৈরি করে। বিশেষ করে যেসব শিশু আর্থসামাজিক সীমাবদ্ধতার কারণে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, তাদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ছিল তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

ধর্ম, বর্ণ কিংবা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে আলাদা করে দেখেননি তিনি। মানুষের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করাই ছিল তাঁর মূল দর্শন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ বহু মানুষের সামনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়।

একজন বিদেশি নাগরিক হয়েও বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার প্রসারে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী সম্পৃক্ততা ছিল ব্যতিক্রমী। সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তাঁর এই অবদান তাঁকে শুধু একজন ধর্মযাজক হিসেবে নয়, বরং একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবক হিসেবেও পরিচিত করেছে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মানবিক অবস্থান

ফাদার মারিনো রিগনের জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণহত্যা, নির্যাতন ও সহিংসতায় যখন বাংলাদেশের মানুষ বিপর্যস্ত, তখন তিনি নিপীড়িত মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন এবং তাদের পাশে দাঁড়ান।

মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালির স্বাধীনতা, আত্মপরিচয় ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। সেই সংকটময় সময়ে বাংলাদেশের মানুষের দুর্দশাকে নিজের উদ্বেগের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন রিগন। তাঁর মানবিক অবস্থান প্রমাণ করে, মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ কেবল নিজের দেশ কিংবা পরিচিত গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

ইতালিতে জন্ম নেওয়া একজন মানুষ হয়েও বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণের দুঃখ-কষ্টের সঙ্গে তিনি নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। ভাষা, ধর্ম ও জাতীয়তার পার্থক্য তাঁর মানবিক দায়িত্ব পালনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিদেশি বন্ধুদের অবদান বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ নিজেদের অবস্থান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। ফাদার রিগন তাঁদের মধ্যে এমন একজন, যাঁর জীবন ও কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের মানুষের প্রতি আন্তরিকতার পরিচয় বহন করে।

তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবিক মূল্যবোধের কোনো নির্দিষ্ট জাতীয় পরিচয় নেই। অন্যায়ের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে একই ভাষায় কথা বলা কিংবা একই ধর্মে বিশ্বাসী হওয়া জরুরি নয়। প্রয়োজন সহমর্মিতা, সাহস এবং মানুষের মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা।

মৃত্যুর পরও বাংলাদেশেই থাকার আকাঙ্ক্ষা

দীর্ঘ কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে ২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ইতালিতে ৯২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন ফাদার মারিনো রিগন। জন্মভূমিতে তাঁর মৃত্যু হলেও বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটেনি।

বাংলাদেশের প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে মৃত্যুর পরও এ দেশের মাটিতে সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন তিনি। তাঁর সেই শেষ ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় ইতালি থেকে তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে আনা হয়।

পরে মোংলার সাধুপালের ক্যাথলিক মিশনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয়। যে দেশের মানুষের জন্য জীবনের দীর্ঘ সময় উৎসর্গ করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই দেশের মাটিতেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হন।

এই ঘটনা তাঁর জীবনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের গভীরতা নতুনভাবে তুলে ধরে। অনেক মানুষের কাছে জন্মভূমিই চিরস্থায়ী ঠিকানা। কিন্তু রিগনের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের কর্ম, মানুষের সঙ্গে আত্মিক বন্ধন এবং দেশের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে জন্মভূমির বাইরেও একটি আপন ঠিকানা খুঁজে দিয়েছিল।

বাংলাদেশে তাঁর সমাধি তাই কেবল একজন বিদেশি ধর্মযাজকের শেষ বিশ্রামস্থল নয়; এটি তাঁর দীর্ঘ মানবিক যাত্রা এবং এ দেশের মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠা নিবিড় সম্পর্কেরও স্মারক।

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অমলিন উত্তরাধিকার

বাংলাদেশের শিক্ষা, সমাজকল্যাণ ও মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৮ সালে ফাদার মারিনো রিগনকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করে বাংলাদেশ সরকার। এই স্বীকৃতি ছিল বাংলাদেশের মানুষের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও সেবার রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন।

সম্মানসূচক নাগরিকত্বের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের আপনজন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তবে তাঁর অবদানের প্রকৃত মূল্য শুধু রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, যেসব মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এবং যে মানবিক দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, সেগুলোর মধ্যেই তাঁর জীবনের স্থায়ী তাৎপর্য নিহিত।

ফাদার রিগনের জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার অনেক বিষয় রয়েছে। মানুষের পরিচয় শুধু জন্মস্থান, ধর্ম কিংবা জাতীয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন মানুষ অন্যের জন্য কতটা কাজ করেছেন, কতজনের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছেন এবং মানুষের দুঃসময়ে কতটা আন্তরিকভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তার মধ্য দিয়েও তাঁর প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায়।

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে তাঁর উদ্যোগ, মুক্তিযুদ্ধের সময় নিপীড়িত মানুষের প্রতি তাঁর সহমর্মিতা এবং এ দেশের মাটিতে সমাহিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান দিয়েছে। তাঁর জীবন দেখিয়েছে, ভালোবাসা শুধু আবেগের বিষয় নয়; মানুষের কল্যাণে দীর্ঘদিন কাজ করার মধ্য দিয়েও সেই ভালোবাসার প্রকাশ ঘটে।

আজকের পৃথিবীতে জাতীয়তা, ধর্ম ও সংস্কৃতির পার্থক্য নিয়ে নানা বিভাজন দেখা যায়। এমন বাস্তবতায় ফাদার মারিনো রিগনের জীবন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তিনি দেখিয়েছেন, অন্য দেশের মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও কল্যাণের জন্য কাজ করাও মানবতার এক উজ্জ্বল প্রকাশ। মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে জন্মভূমির সীমানা পেরিয়েও একটি দেশের মানুষের আপনজন হয়ে ওঠা সম্ভব।

ইতালিতে জন্ম নিয়েও তিনি বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিলেন। তাঁর জীবন ও কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষা, মানবসেবা, সহমর্মিতা এবং মুক্তিকামী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা জোগাবে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের এই অকৃত্রিম বিদেশি বন্ধু, শিক্ষানুরাগী ও মানবদরদি মানুষটির প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।

আপনি জন্মেছিলেন ইতালিতে, কিন্তু আপনার ভালোবাসার ঠিকানা হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ। এ দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি আপনার নিবেদন আপনাকে আমাদের ইতিহাসের অংশ করে রেখেছে। আপনার কর্ম, আদর্শ ও মানবিকতার স্মৃতি বেঁচে থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

বিনম্র শ্রদ্ধা, ফাদার মারিনো রিগন।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।