মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করে নতুন অধ্যাদেশ জারি করেছে সরকার। নতুন বিধান অনুযায়ী, সাধারণ নিবন্ধিত, তালিকাভুক্ত, নিবন্ধনযোগ্য বা তালিকাভুক্তিযোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সংশ্লিষ্ট কর মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে হবে। তবে সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান এবং শূন্য রিটার্ন দাখিলকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য এ সময়সীমা ২০ দিন।
গত ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় ‘মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ প্রকাশ করা হয়। এর আগে ১৩ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অধ্যাদেশটি জারি করেন। এতে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ৬৪ ধারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অধ্যাদেশটি ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য হবে।
নতুন বিধানের মাধ্যমে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা নির্দিষ্ট করার পাশাপাশি রিটার্নে প্রয়োজনীয় তথ্য অন্তর্ভুক্তি এবং ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে রিটার্ন জমা দেওয়ার বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ক্ষমতাও স্পষ্ট করা হয়েছে। নিয়মিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য করদাতার জন্য এসব বিধান গুরুত্বপূর্ণ।
কারা কত দিনের মধ্যে রিটার্ন জমা দেবেন
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সাধারণ নিবন্ধিত, তালিকাভুক্ত, নিবন্ধনযোগ্য বা তালিকাভুক্তিযোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে কর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে হবে। অন্যদিকে, সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান এবং শূন্য রিটার্ন দাখিলকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ২০ দিনের মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে পারবে।
শূন্য রিটার্নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর মেয়াদে ঘোষণাযোগ্য লেনদেন বা প্রদেয় করের পরিমাণ শূন্য হতে পারে। তবে লেনদেন না থাকলেই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব ধরনের করসংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পাবে, এমন নয়। সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধান অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারিত হবে।
করদাতাদের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা মেনে চলা জরুরি। কারণ, রিটার্ন দাখিলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর মেয়াদের লেনদেন, প্রদেয় কর এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সম্পূরক শুল্কের তথ্য কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সঠিক তথ্যসহ রিটার্ন জমা দেওয়া কর পরিপালনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সরকারি ছুটিতে সময়সীমা শেষ হলে সুযোগ
নতুন অধ্যাদেশে রিটার্ন দাখিলের নির্ধারিত ১৫তম দিনে সরকারি ছুটি থাকলে পরবর্তী কার্যদিবসে রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়সীমার শেষ দিন ছুটির সঙ্গে মিলে গেলে করদাতারা পরবর্তী কার্যদিবসে রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন।
এ ছাড়া জনস্বার্থে এনবিআর আদেশের মাধ্যমে সুদ ও জরিমানা ছাড়াই রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বাড়াতে পারবে। তবে এ সুবিধা স্বয়ংক্রিয় নয়। এনবিআর এ বিষয়ে আদেশ জারি করলেই কেবল সংশ্লিষ্ট করদাতারা বর্ধিত সময়ের সুবিধা নিতে পারবেন।
এ কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য করদাতার উচিত নির্ধারিত সময়সীমা অনুসরণ করার পাশাপাশি এনবিআরের প্রাসঙ্গিক নির্দেশনা সম্পর্কে খোঁজ রাখা। বিশেষ পরিস্থিতিতে সময় বাড়ানোর আদেশ জারি হলে তার শর্ত ও কার্যকারিতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
রিটার্নে সম্পূরক শুল্কের তথ্য দিতে হবে
অধ্যাদেশে ভ্যাট রিটার্নের তথ্যসংক্রান্ত বিধানেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, মূসক রিটার্নে সম্পূরক শুল্ক পরিশোধের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যেসব পণ্য বা সেবার ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী সম্পূরক শুল্ক প্রযোজ্য, সেগুলোর সংশ্লিষ্ট তথ্য রিটার্নে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন হবে।
এনবিআর আদেশের মাধ্যমে কোনো নিবন্ধিত বা তালিকাভুক্ত ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের জন্য ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করতে পারবে। অর্থাৎ, কর্তৃপক্ষের আদেশের আওতায় আসা করদাতাদের নির্ধারিত ইলেকট্রনিক ব্যবস্থায় রিটার্ন জমা দিতে হবে।
এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে হিসাবপত্র, লেনদেনের বিবরণ এবং কর পরিশোধের তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। রিটার্নে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাবের সামঞ্জস্য থাকাও গুরুত্বপূর্ণ। ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য জমা পড়লে পরবর্তী সময়ে ব্যাখ্যা দেওয়া কিংবা সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।
সংবিধানের ক্ষমতাবলে অধ্যাদেশ জারি
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ অধিবেশনে না থাকায় এবং জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের ১ উপ-অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি এটি জারি করেছেন। এর মাধ্যমে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ৬৪ ধারার পরিবর্তে নতুন বিধান কার্যকর করা হয়েছে।
অধ্যাদেশটি ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য হওয়ায় সংশ্লিষ্ট করদাতাদের রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কার্যকারিতার তারিখ ও প্রযোজ্য কর মেয়াদ বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষ করে নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাবরক্ষণ ও কর পরিপালন কার্যক্রম নতুন বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা প্রয়োজন।
নতুন নিয়মে সাধারণ করদাতাদের জন্য ১৫ দিন এবং নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও শূন্য রিটার্ন দাখিলকারীদের জন্য ২০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি, ছুটির দিনে সময়সীমা শেষ হলে পরবর্তী কার্যদিবসে রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ এবং জনস্বার্থে সময় বাড়ানোর ক্ষমতা এনবিআরকে দেওয়া হয়েছে। করদাতাদের নিজ নিজ শ্রেণি অনুযায়ী বিধানগুলো যাচাই করে সময়মতো রিটার্ন দাখিল করা উচিত।









