,

বগাকে ধরতে অভিযান, চট্টগ্রাম ছাড়লেন ওসি আবদুর রহিম

চট্টগ্রাম নগরীর সিটি করপোরেশনের নগর ভবনে পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালানোর ঘটনায় আলোচনায় আসা খুলশী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুর রহিমকে চট্টগ্রাম ছাড়তে হয়েছে। তাকে খুলনা পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে বদলি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। এর আগে তাকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সিটি স্পেশাল ব্রাঞ্চে (সিটিএসবি) বদলি করা হয়েছিল।

পুলিশ সদর দপ্তরের প্রশাসন শাখা গত ৮ অক্টোবর এ-সংক্রান্ত নতুন বদলির আদেশ জারি করে। প্রশাসন শাখার অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক এ কে এম আওলাদ হোসেনের সই করা আদেশে বলা হয়, জনস্বার্থে মো. আবদুর রহিমকে খুলনা পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে পদায়ন করা হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, ১০ অক্টোবরের মধ্যে তাকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে ছাড়পত্র নিতে হতো। তা না হলে ১১ অক্টোবর থেকে তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ হিসেবে গণ্য করার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তিনি ছাড়পত্র নিয়েছেন।

শনিবার (১০ অক্টোবর) সিএমপি সদর দপ্তরে বদলির আদেশ পৌঁছানোর পর বিষয়টি জানাজানি হয়। এ বিষয়ে আবদুর রহিম বলেন, পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি সিএমপি থেকে ছাড়পত্র নিয়েছেন। কয়েক দিনের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেবেন বলেও জানান তিনি।

নগর ভবনে অভিযান ঘিরে বিতর্ক

ঘটনার সূত্রপাত গত মঙ্গলবার রাতে। চট্টগ্রাম নগরীর মতিঝরনা এলাকায় অবস্থিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) নগর ভবনে পুলিশ অবস্থান নেয়। সেখানে ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা রয়েছেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালানো হয়েছিল বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

বগা চট্টগ্রাম নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত যুগ্ম আহ্বায়ক। পুলিশের দাবি, তিনি নগরীর অপরাধজগতের সঙ্গে যুক্ত এবং তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ, হামলা, পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর ও বিস্ফোরক আইনে অন্তত ১৭টি মামলা রয়েছে। খুলশী এলাকার কিশোর গ্যাংগুলোর সঙ্গেও তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে পুলিশের ভাষ্য।

সরকারি জমি দখলকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে গোলাগুলির ঘটনার পর গত ৮ জুন বগাকে স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে বহিষ্কার করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর অভিযোগ, সেগুলোর বর্তমান অবস্থা এবং প্রতিটি ঘটনায় তার দায় আদালতে কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা আলাদাভাবে বিবেচনার বিষয়।

নগর ভবনে পুলিশের অবস্থান নেওয়ার পরদিন বুধবার চট্টগ্রাম নগরীর ঈদগাঁও এলাকায় ডেঙ্গু সচেতনতামূলক একটি কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। সেখানে তিনি ওসি আবদুর রহিমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। মেয়রের অভিযোগ, আবদুর রহিম আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাকলিয়া থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। খুলশী থানার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি আওয়ামী লীগ বা যুবলীগের কাউকে গ্রেপ্তার করেননি বলেও দাবি করেন মেয়র।

বগার বিষয়ে মেয়র আরও বলেন, ওয়াকিল হোসেন আওয়ামী লীগ সরকারের অপশাসনের শিকার এবং তিনি দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। তাকে ‘জুলাইযোদ্ধা’ আখ্যা দিয়ে মেয়র দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা করা হয়েছিল।

মেয়রের বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবদুর রহিমকে খুলশী থানা থেকে সরিয়ে সিটিএসবিতে বদলি করা হয়। পরে পুলিশ সদর দপ্তরের আদেশে তাকে খুলনা পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে পাঠানো হয়। তবে ধারাবাহিক এই বদলির সঙ্গে মেয়রের বক্তব্যের সরাসরি প্রশাসনিক সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে আদেশে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

বগাকে ঘিরে আগের সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

বগাকে কেন্দ্র করে খুলশী থানার পুলিশের সঙ্গে বিরোধের ঘটনাও এর আগে সামনে এসেছিল। চলতি বছরের আগস্টে পাহাড়তলী কলেজের এক শিক্ষককে অপহরণ ও মারধরের অভিযোগ থানায় আসে। ওই অভিযোগে বগার বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা নথিভুক্ত করেন ওসি আবদুর রহিম।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মামলা দায়েরের পর বগা ফোনে ওসিকে গালাগাল ও হুমকি দেন। পরে ওই মামলায় তাকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালাতে গিয়ে ৪ সেপ্টেম্বর নগরীর ওয়্যারলেস এলাকায় পুলিশের দল হামলার মুখে পড়ে বলে অভিযোগ ওঠে। পুলিশের দাবি, বগা ও তার সহযোগীরা ওই হামলায় জড়িত ছিলেন এবং পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এতে ওসি আবদুর রহিমসহ পুলিশের সাত সদস্য আহত হন।

তবে এ ঘটনার বিষয়ে বগার পরিবারের পক্ষ থেকেও পাল্টা অভিযোগ করা হয়েছে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর বগার বাবা মোহাম্মদ জাভেদ আদালতে ওসি আবদুর রহিম, খুলশী থানার দুই সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) এবং আরও পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

ওই মামলায় অভিযোগ করা হয়, ৪ সেপ্টেম্বর পুলিশের অভিযানের সময় বগাকে মারধর করা হয়েছিল এবং তাদের বাড়িতে থাকা মূল্যবান জিনিসপত্র ভাঙচুর করা হয়। আদালত অভিযোগটি গ্রহণ করে তদন্তের জন্য অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেন।

ফলে একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুরের অভিযোগের পাশাপাশি পুলিশের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও বাড়িঘরের জিনিসপত্র নষ্ট করার অভিযোগও তদন্তের আওতায় এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তদন্তের ফল এবং আদালতের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

কিশোর গ্যাংয়ের বিরোধে প্রাণ গেল হৃদয়ের

খুলশী এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে খুলশী থানার ওয়্যারলেস কলোনির তালতলা এলাকায় হৃদয় নামের এক কিশোরকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়।

ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে আট কিশোরকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, দুটি কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে সিনিয়র-জুনিয়র বিরোধকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডটি ঘটে থাকতে পারে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিহত হৃদয় ‘ফাইভ স্টার’ গ্যাংয়ের সদস্য ছিলেন। হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার আটজন ‘সেভেন স্টার’ গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা এবং রকিবুল ইসলাম ওরফে পিচ্চির বিরুদ্ধে ‘সেভেন স্টার’ পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় বিজয়, কামরান ও শান্তর নেতৃত্বে ‘ফাইভ স্টার’ পরিচালিত হয় বলে পুলিশের ভাষ্য।

তবে এসব গ্যাংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং হত্যাকাণ্ডে কার কী ভূমিকা ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। কিশোরদের মধ্যে দলীয় আধিপত্য, বয়সভিত্তিক নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

বদলির পরও যেসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন

ওসি আবদুর রহিমের চট্টগ্রাম থেকে বদলি হওয়ার ঘটনা শুধু একজন পুলিশ কর্মকর্তার কর্মস্থল পরিবর্তনের বিষয়েই সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নগর ভবনে পুলিশের অভিযান, রাজনৈতিক বক্তব্য, বগার বিরুদ্ধে একাধিক মামলার অভিযোগ, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা এবং পুলিশের বিরুদ্ধেই আদালতে দায়ের করা মামলা।

একদিকে পুলিশের দাবি, বগাকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে তাদের সদস্যরা হামলার শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে বগার পরিবারের অভিযোগ, অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মারধর ও ভাঙচুর করেছেন। দুটি পক্ষের অভিযোগই যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।

এ ক্ষেত্রে বদলির আদেশকে কোনো পক্ষের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রশাসনিক বদলি এবং অপরাধের অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি পৃথক বিষয়। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন; একইভাবে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন অভিযোগের বিষয়টিও প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।

চট্টগ্রাম নগরীর কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা এবং পুলিশের কার্যক্রমের জবাবদিহি নিশ্চিত করা—এই তিনটি বিষয় এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নগর ভবনে অভিযানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিতর্কের পাশাপাশি বগাকে ঘিরে সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি মামলা ও হৃদয় হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কতটা স্বচ্ছভাবে এগোয়, তার ওপরও জনআস্থা অনেকাংশে নির্ভর করবে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।