বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে আওয়ামী লীগ বিশ্ব আন্তপার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) কাছে যে অভিযোগ করেছিল, তদন্তে তার সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তের পর বাংলাদেশের নাম কালো তালিকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আইপিইউর এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ এবং সংস্থাটির নির্বাহী কমিটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধির অন্তর্ভুক্তিকে আন্তর্জাতিক সংসদীয় কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।
রোববার (১১ অক্টোবর) সকালে তানজানিয়ায় আইপিইউর সম্মেলন শেষে দেশে ফিরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্পিকার এসব কথা বলেন।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানান, গত এপ্রিলে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে আইপিইউর ১৫২তম অ্যাসেম্বলিতে আওয়ামী লীগের নেতারা বাংলাদেশে তাঁদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। পরে অভিযোগটি খতিয়ে দেখতে আইপিইউর সদস্যরা ঢাকা সফর করেন। স্পিকারের দাবি, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মেলেনি এবং বাংলাদেশের নাম কালো তালিকা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
তবে তদন্তের ফলাফল ও কালো তালিকা থেকে বাংলাদেশের নাম প্রত্যাহারের বিষয়ে আইপিইউর আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন বা পৃথক বিবৃতি এখানে পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে স্পিকারের বক্তব্যকে তাঁর দাবি হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
গণতন্ত্রের সংগ্রাম আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরার দাবি
স্পিকার বলেন, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের সামনে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং গত ১৬ বছরে গণতন্ত্রের জন্য দেশের মানুষের সংগ্রামের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, বাংলাদেশের জনগণের দীর্ঘ আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার বিবরণ শুনে আইপিইউর প্রতিনিধিরা মর্মাহত হয়েছেন।
হাফিজ উদ্দিন আহমদের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মহলে যে ভুল ধারণা তৈরি হয়েছিল, তা দূর করতে সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দেশের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরার পাশাপাশি বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আন্তর্জাতিক সংসদীয় ফোরামগুলোতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের প্রতিনিধিত্বের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এসব আলোচনায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের আইনপ্রণেতারা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার এবং পারস্পরিক মতবিনিময়ের সুযোগ পান। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আইপিইউর সম্মেলনটি সেই সুযোগ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন স্পিকার।
এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের চেয়ারম্যান বাংলাদেশি স্পিকার
তানজানিয়ায় ৫ থেকে ৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত আইপিইউর সম্মেলনে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ছিল এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের (এপিজি) সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ।
গত ৫ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে এ দায়িত্ব গ্রহণ করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি ভুটানের স্পিকার টেম্পা দর্জির কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেন। স্পিকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি এক বছরের জন্য এ দায়িত্ব পালন করবেন।
এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপে ৩৭টি দেশ সদস্য হিসেবে রয়েছে। এই গ্রুপের নেতৃত্ব বাংলাদেশের হাতে আসায় আঞ্চলিক সংসদীয় আলোচনায় দেশটির অংশগ্রহণ আরও জোরালো করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন দেশের আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি, অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা এবং আন্তর্জাতিক সংসদীয় কার্যক্রমে সমন্বয় সাধনে এই দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
আইপিইউর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থায় নেতৃত্বের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সংলাপ ও সহযোগিতার ক্ষেত্র বিস্তৃত হয়। তবে এ ধরনের পদে দায়িত্ব গ্রহণের তাৎপর্য নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশ কীভাবে সেই সুযোগ কাজে লাগায় এবং আলোচনায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তার ওপর।
আইপিইউর নির্বাহী কমিটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধি
একই দিন, ৫ অক্টোবর, আইপিইউর ১৫৩তম অ্যাসেম্বলিতে এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের পক্ষ থেকে নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরী।
এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সংসদীয় পরিসরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের আরেকটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে স্পিকারের দায়িত্ব গ্রহণ এবং নির্বাহী কমিটিতে একজন বাংলাদেশি সংসদ সদস্যের অন্তর্ভুক্তি—দুটি ঘটনাই সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে উঠে এসেছে।
আইপিইউর নির্বাহী কমিটি সংস্থাটির কার্যক্রম ও সাংগঠনিক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধির অন্তর্ভুক্তি আন্তর্জাতিক সংসদীয় কার্যক্রম সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন এবং বিভিন্ন দেশের আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ দিতে পারে।
ছয় দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক
তানজানিয়ায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বাংলাদেশের ১৩ সদস্যের সংসদীয় প্রতিনিধি দল অংশ নেয়। প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
সম্মেলনের বিভিন্ন কার্যক্রমের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান, বাহরাইন, ভুটান, কানাডা ও তুরস্কের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা করে বাংলাদেশি প্রতিনিধি দল। এ ছাড়া মানবাধিকার কমিশনের সঙ্গেও বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে জানান স্পিকার।
তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে। এসব বৈঠককে তিনি সফরের সাফল্যের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
দ্বিপক্ষীয় সংসদীয় আলোচনা আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। আইনপ্রণেতাদের মধ্যে সরাসরি মতবিনিময়ের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, নীতিগত অগ্রাধিকার ও অভিন্ন স্বার্থের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব হয়।
প্রতিনিধি দলে ছিলেন যাঁরা
স্পিকারের সফরসঙ্গী হিসেবে জাতীয় সংসদের হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপুসহ কয়েকজন সংসদ সদস্য তানজানিয়া সফর করেন। প্রতিনিধি দলের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন সরওয়ার জামাল নিজাম, এ. ই. সুলতান মাহমুদ বাবু, মো. শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, এস কে আজিজুল বারী, হুমাম কাদের চৌধুরী, মীর আহমাদ বিন কাসেম, সানসিলা জেবরিন এবং রোকেয়া বেগম।
জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়াও প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সফরে অংশ নেন। দেশে ফেরার পর রোববার সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁদের স্বাগত জানান জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আইপিইউর সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একদিকে মানবাধিকার-সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে স্পিকারের বক্তব্য আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে, অন্যদিকে এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের নেতৃত্ব ও নির্বাহী কমিটিতে প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে সংসদীয় কূটনীতিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের অভিযোগের তদন্ত এবং কালো তালিকা থেকে বাংলাদেশের নাম প্রত্যাহারের বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান নিশ্চিত করতে আইপিইউর আনুষ্ঠানিক নথি বা বিবৃতি গুরুত্বপূর্ণ।









