,

মৌখিক পরীক্ষা না দিয়েও ফ্যামিলি কার্ডের চূড়ান্ত তালিকায় বিএনপি নেতার স্ত্রীর নাম

নাটোরের লালপুরে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী পদে নিয়োগের চূড়ান্ত তালিকায় এমন এক প্রার্থীর নাম এসেছে, যিনি নিজেই জানিয়েছেন, বয়সসীমা অতিক্রম করায় তাঁকে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। ওই প্রার্থী সোনিয়া খাতুনের দাবি, পরীক্ষার দিন বয়স ৪০ বছরের বেশি হওয়ায় তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অথচ পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ ঘটনায় নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, বয়স যাচাই এবং প্রার্থী নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সোনিয়া খাতুন লালপুর উপজেলার আড়বাব ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম জেনেটের স্ত্রী। ঘটনাটি ঘটেছে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুলের নির্বাচনি এলাকার অন্তর্ভুক্ত লালপুর উপজেলায়।

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী পদে আবেদনের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ছিল ৪০ বছর। সোনিয়া খাতুনের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর জন্ম ১৯৮৪ সালে। সে হিসাবে তাঁর বর্তমান বয়স ৪২ বছর। ফলে নির্ধারিত বয়সসীমার সঙ্গে তাঁর বয়সের অসংগতি রয়েছে।

সোনিয়া খাতুন জানান, মৌখিক পরীক্ষা দিতে নির্ধারিত স্থানে গেলেও তাঁকে পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। তাঁর ভাষ্য, পরীক্ষক তাঁকে জানিয়েছিলেন, বয়স ৪০ বছরের বেশি হওয়ায় তাঁর মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়। এরপর তিনি পরীক্ষা না দিয়েই ফিরে যান।

সোনিয়া খাতুন বলেন, ‘বয়স বেশি হওয়ায় মৌখিক পরীক্ষার দিন আমার পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। পরীক্ষক জানান, বয়স ৪০ বছরের বেশি হওয়ায় মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে আমাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরে আমি মৌখিক পরীক্ষা না দিয়েই ফিরে গেছি। তবে চূড়ান্ত ফলাফলে আমার নাম এসেছে।’

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মৌখিক পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার পরও চূড়ান্ত তালিকায় নাম আসার বিষয়টি তাঁর নিজের কাছেও প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে কীভাবে তাঁর নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে, সে বিষয়ে নিয়োগ কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

তদন্তের আশ্বাস উপজেলা প্রশাসনের

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে লালপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, ঘটনাটি তাঁর জানা নেই। তবে খোঁজ নিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হবে।

লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবীর হোসেন বলেন, বয়সসীমা অতিক্রম করা এবং মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারার পরও কীভাবে সোনিয়া খাতুনের নাম চূড়ান্ত তালিকায় এসেছে, তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে তাঁর বয়স, আবেদনসংক্রান্ত তথ্য এবং মৌখিক পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি যাচাইয়ে নিয়োগ কর্তৃপক্ষ কোন নথি বা পদ্ধতি অনুসরণ করেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। চূড়ান্ত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির পেছনে প্রশাসনিক ভুল, তথ্য যাচাইয়ের ঘাটতি কিংবা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হতে পারে।

নিয়োগপ্রক্রিয়ায় নির্ধারিত বয়সসীমা ও পরীক্ষার শর্ত সব প্রার্থীর ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে কি না, সেটিও যাচাইয়ের বিষয়। একই সঙ্গে চূড়ান্ত তালিকা তৈরির আগে আবেদনকারীদের যোগ্যতা এবং পরীক্ষায় অংশগ্রহণের তথ্য যথাযথভাবে মিলিয়ে দেখা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

নিয়োগের ফল প্রকাশ ঘিরে আগেও উত্তেজনা

লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলা সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুলের নির্বাচনি এলাকার অন্তর্ভুক্ত। এর আগে এই দুই উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফল প্রকাশকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। সে সময় দুই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।

প্রত্যক্ষদর্শী এবং জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, ১২ আগস্ট দুপুরে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহের জন্য সুপারভাইজার ও কর্মী নিয়োগের ফল প্রকাশ করা হয়। এরপর নিয়োগে আওয়ামী লীগের লোকজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগ তোলেন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। অভিযোগের প্রতিবাদে স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন।

বাগাতিপাড়া উপজেলার মালঞ্চি রেলগেট এলাকা থেকে উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সোহেল রানার নেতৃত্বে একটি মিছিল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে গিয়ে অবস্থান নেয়। সেখানে বিক্ষোভকারীরা নিয়োগে অনিয়ম ও বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে স্লোগান দেন।

একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, বিক্ষোভকারীদের একাংশ ইউএনওর কক্ষে ভাঙচুর করেন এবং ইউএনওসহ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করেন। এ সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকদের মারধর, তাঁদের মোবাইল ফোন ও ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়া এবং ধারণ করা তথ্য মুছে ফেলার অভিযোগও ওঠে।

ঘটনার সময় পুলিশ উপস্থিত থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছিল। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ দেওয়ার পরদিন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার, নাটোরের জেলা প্রশাসক এবং লালপুর ও বাগাতিপাড়ার ইউএনওকে বদলি করা হয়। ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়।

পরবর্তী সময়ে নাটোর জেলায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারির জন্য নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছিল। সম্প্রতি সেই নিয়োগের ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। আর নতুন করে সোনিয়া খাতুনের নাম চূড়ান্ত তালিকায় আসার ঘটনাটি নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন সামনে এনেছে।

স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন নথি যাচাই

ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য তথ্য সংগ্রহকারীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের যোগ্যতা, বয়সসীমা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের কাজের সঙ্গে কর্মসূচির উপকারভোগীদের তথ্য যাচাই ও নথিভুক্ত করার বিষয়টি যুক্ত।

সোনিয়া খাতুনের ক্ষেত্রে বয়সসীমা অতিক্রমের তথ্য এবং মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারার দাবি সত্য হলে, চূড়ান্ত তালিকায় তাঁর নাম কীভাবে এল, তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন। এ জন্য আবেদনপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্রে থাকা জন্মতারিখ, মৌখিক পরীক্ষার উপস্থিতির নথি এবং চূড়ান্ত ফলাফল প্রস্তুতের প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে নিয়োগে অনিয়ম হয়েছে বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তবে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা জরুরি। উপজেলা প্রশাসন তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে। সেই তদন্তে কী তথ্য পাওয়া যায় এবং কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নেয়, তার ওপরই এ ঘটনার পরবর্তী অগ্রগতি নির্ভর করছে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।