,

কাজী মোতাহার হোসেন: বিজ্ঞান, সাহিত্য ও মুক্তচিন্তার পথিকৃৎ

কিছু মানুষের জীবনাবসান ঘটে, কিন্তু তাঁদের চিন্তা ও কর্মের প্রভাব থেকে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম। জ্ঞান, যুক্তিবাদ ও মানবিকতার চর্চায় যাঁরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন, তাঁদের অবদান সময়ের সীমা অতিক্রম করে সমাজকে পথ দেখায়। কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন তেমনই এক বিরল মনীষী। বিজ্ঞানী, পরিসংখ্যানবিদ, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও মুক্তবুদ্ধির অনুসারী হিসেবে তিনি বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র স্থান অধিকার করে আছেন। তাঁর জীবন ছিল জ্ঞান অন্বেষণ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার এক নিরন্তর প্রচেষ্টা।

১৮৯৭ সালের ৩০ জুলাই কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন কাজী মোতাহার হোসেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার বাগমারা গ্রামে। মেধা, অধ্যবসায় ও জ্ঞানচর্চার প্রতি গভীর অনুরাগের মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন দেশের অন্যতম বিশিষ্ট মনীষী হিসেবে। তাঁর কৃতিত্ব শুধু শিক্ষাজীবনের সাফল্য কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক পদমর্যাদায় সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং জ্ঞানকে সমাজের কল্যাণে কাজে লাগানোর মানসিকতাই তাঁকে অনন্য করে তুলেছিল।

তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল জীবিকা অর্জন নয়। প্রকৃত শিক্ষা মানুষের বিচারবোধকে শাণিত করে, প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করতে শেখায় এবং অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তির ওপর নির্ভর করতে উদ্বুদ্ধ করে। তাঁর জীবন ও কর্মে এই দর্শনের প্রতিফলন ঘটেছে বারবার।

মেধা ও অধ্যবসায়ে গড়া শিক্ষাজীবন

শৈশব থেকেই কাজী মোতাহার হোসেনের মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। বৃত্তি নিয়ে শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে তিনি ১৯১৫ সালে কুষ্টিয়া মুসলিম হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যয়ন করেন। সেখানে প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সান্নিধ্য তাঁর জ্ঞানচর্চা ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সমৃদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯১৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্সসহ বিএ পরীক্ষায় বাংলা ও আসাম অঞ্চলে প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি। ১৯২১ সালে এমএ পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞানে দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন। তাঁর এই সাফল্য ছিল মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের সম্মিলিত ফল।

তবে কাজী মোতাহার হোসেনের প্রকৃত পরিচয় কেবল একজন মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে নয়। জ্ঞানের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ, সত্য অনুসন্ধানের আগ্রহ এবং নতুন বিষয় জানার নিরন্তর চেষ্টা তাঁকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি সেই জ্ঞানকে মানুষের উপকারে ব্যবহার করাও জরুরি।

তাঁর চিন্তায় শিক্ষা ও মানবিকতার মধ্যে ছিল নিবিড় সম্পর্ক। বিজ্ঞান তাঁকে শিখিয়েছিল তথ্য ও প্রমাণের গুরুত্ব, আর সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ তাঁকে মানুষের জীবনকে বৃহত্তর পরিসরে বুঝতে সাহায্য করেছিল। এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তী সময়ে তাঁর শিক্ষকতা, গবেষণা ও সাহিত্যচর্চাকে প্রভাবিত করে।

বাংলাদেশের পরিসংখ্যান শিক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা

কাজী মোতাহার হোসেন বাংলাদেশের পরিসংখ্যানচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ডেমনস্ট্রেটর হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯২৩ সালে একই বিভাগে সহকারী প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি শিক্ষকতা ও গবেষণার দীর্ঘ অধ্যায়ে প্রবেশ করেন।

তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পরিসংখ্যানকে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। পরিসংখ্যানের সাহায্যে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ, বিভিন্ন ঘটনার প্রবণতা শনাক্ত এবং প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব। বিজ্ঞান, অর্থনীতি, জনসংখ্যা বিশ্লেষণ ও সামাজিক গবেষণাসহ বহু ক্ষেত্রে এ বিদ্যার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। হোসেন এমন এক সময়ে এর বিকাশে কাজ করেন, যখন এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ আজকের তুলনায় সীমিত ছিল।

১৯৩৮ সালে তিনি ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট থেকে পরিসংখ্যানে ডিপ্লোমা অর্জন করেন। ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। একই বছর তিনি রিডার হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন এবং ১৯৫৪ সালে অধ্যাপক হন।

১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যানে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পাঠক্রম চালুর উদ্যোগে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এই উদ্যোগ দেশের উচ্চশিক্ষায় পরিসংখ্যানের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে।

১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত পরিসংখ্যান গবেষণা ও শিক্ষণ ইনস্টিটিউটের প্রথম পরিচালক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে পরিসংখ্যান শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রকে আরও সুসংগঠিত করার সুযোগ তৈরি হয়। ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়, যা তাঁর দীর্ঘদিনের শিক্ষকতা ও গবেষণার স্বীকৃতি বহন করে।

১৯৬১ সালে নিয়মিত চাকরি থেকে অবসর নিলেও জ্ঞানচর্চা থেকে বিচ্ছিন্ন হননি তিনি। তাঁর জীবন দেখিয়েছে, একজন শিক্ষকের দায়িত্ব কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কিংবা নির্ধারিত কর্মঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুসন্ধিৎসা তৈরি করা, গবেষণার পথ উন্মুক্ত করা এবং নতুন প্রজন্মকে জ্ঞান অর্জনে উৎসাহিত করাও একজন শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

পরিসংখ্যান শিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদান তাই ব্যক্তিগত অর্জনের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর সমাজের সম্পদে পরিণত হয়েছে। তাঁর উদ্যোগ ও কর্মপরিসর বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় এই বিদ্যার বিকাশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

বিজ্ঞানমনস্কতার সঙ্গে সাহিত্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন

বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিতি অর্জন করলেও কাজী মোতাহার হোসেনের আগ্রহের জগৎ ছিল বহুমাত্রিক। পদার্থবিজ্ঞান ও পরিসংখ্যানের পাশাপাশি সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং মানবিক চিন্তার প্রতিও তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। বৈজ্ঞানিক যুক্তির কঠোরতা ও সাহিত্যিক সংবেদনশীলতার এই সমন্বয় তাঁর ব্যক্তিত্বকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছিল।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল জীবনের স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটি। নজরুল তাঁকে স্নেহভরে ‘মতিহার’ নামে ডাকতেন। তাঁদের সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতায় গড়া। এই বন্ধুত্বের মধ্য দিয়ে বিজ্ঞান ও সাহিত্যচর্চার দুই ভিন্ন জগতের মানুষের মধ্যে সৃজনশীল যোগাযোগের একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।

হোসেনের কাছে সাহিত্য ছিল মানুষের অনুভূতি, সামাজিক অভিজ্ঞতা ও জীবনবোধ উপলব্ধির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অন্যদিকে, বিজ্ঞান তাঁকে শিখিয়েছিল পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতি। এই দুই ধারার সমন্বয় তাঁর চিন্তাকে আরও বিস্তৃত করেছিল।

তিনি দেখিয়েছেন, বিজ্ঞানমনস্ক হওয়ার অর্থ সাহিত্য বা শিল্প থেকে দূরে থাকা নয়। বরং যুক্তিবাদী চিন্তা ও মানবিক সংবেদনশীলতা পাশাপাশি থাকলে মানুষের উপলব্ধি আরও গভীর ও ভারসাম্যপূর্ণ হতে পারে। তাঁর জীবন এই সমন্বয়ের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

মুসলিম সাহিত্য সমাজ ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা

১৯২৬ সালে কাজী আবদুল ওদুদ, সৈয়দ আবুল হোসেন ও আবুল ফজলসহ সমমনা চিন্তাবিদদের সঙ্গে কাজী মোতাহার হোসেন ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন। সংগঠনটি তৎকালীন সমাজে যুক্তিবাদী চিন্তা, প্রগতিশীল মনন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সেই সময় প্রচলিত বিশ্বাস ও সামাজিক রীতিনীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা অনেক ক্ষেত্রেই সহজ ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে উৎসাহিত করা ছিল সাহসী উদ্যোগ। মুসলিম সাহিত্য সমাজের চিন্তাধারায় জ্ঞানচর্চা, যুক্তির ব্যবহার এবং মানুষের বিচারবোধকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

কাজী মোতাহার হোসেন ‘শিখা’ পত্রিকার সম্পাদনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। পত্রিকাটিকে কেন্দ্র করে যুক্তিবাদী ও প্রগতিশীল চিন্তার প্রসারে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর তৈরি হয়। সাহিত্য ও প্রবন্ধের মাধ্যমে সমাজের প্রচলিত ধারণা, শিক্ষা এবং মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

এই উদ্যোগের মূল তাৎপর্য ছিল মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখানো। কোনো ধারণা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত বলে সেটিকে প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়—এমন মনোভাব যুক্তিবাদী সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য। হোসেনের চিন্তায় এই উপলব্ধি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছিল।

তাঁর কাছে জ্ঞান ছিল শুধু তথ্য সংগ্রহের বিষয় নয়; এটি ছিল স্বাধীনভাবে চিন্তা করার শক্তি। বিজ্ঞান সত্য অনুসন্ধানের পদ্ধতি দেয়, সাহিত্য মানুষের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত করে, আর মুক্তবুদ্ধি মানুষকে নিজের বিবেক ও বিচারবোধের ওপর নির্ভর করতে শেখায়।

বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন হিসেবেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। বিজ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক বিভিন্ন গ্রন্থ ও প্রবন্ধ রচনার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা ভাষায় জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরস্পরের বিরোধী নয়; বরং এগুলো মানুষের চিন্তাকে ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে সমৃদ্ধ করতে পারে।

পরিবারেও জ্ঞান ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার

কাজী মোতাহার হোসেনের পারিবারিক জীবনেও শিক্ষা ও সংস্কৃতির উপস্থিতি লক্ষণীয়। তাঁর সন্তানদের মধ্যে রয়েছেন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী ড. সনজীদা খাতুন, ফাহমিদা খাতুন, মাহমুদা খাতুন এবং জনপ্রিয় লেখক কাজী আনোয়ার হোসেন। তাঁর কন্যা জোবায়দা মির্জা ও ওবায়দা সাদও শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁদের আগ্রহের পরিচয় বহন করে। একটি পরিবারে জ্ঞানচর্চা, সৃজনশীলতা এবং স্বাধীন চিন্তার পরিবেশ কীভাবে প্রজন্মকে প্রভাবিত করতে পারে, তাঁদের জীবন তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

তবে হোসেনের উত্তরাধিকার শুধু তাঁর পরিবারের সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের বিজ্ঞানশিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গবেষণা, সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা এবং মুক্তবুদ্ধির আন্দোলনের ইতিহাসেও তাঁর অবদান ছড়িয়ে রয়েছে। ব্যক্তিগত প্রতিভাকে সামাজিক কল্যাণের কাজে লাগানোর যে দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেছেন, তা তাঁর স্মৃতিকে আরও অর্থবহ করেছে।

বর্তমান সময়েও প্রাসঙ্গিক তাঁর চিন্তা

১৯৮১ সালের ৯ অক্টোবর কাজী মোতাহার হোসেন মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর পার্থিব জীবনের অবসান ঘটলেও তাঁর কাজ ও চিন্তার গুরুত্ব হারিয়ে যায়নি। বরং জ্ঞান, যুক্তি ও মানবিকতার প্রশ্নে তাঁর জীবন আজও প্রাসঙ্গিক।

বর্তমান বিশ্বে তথ্য ও প্রযুক্তির বিস্তার মানুষের সামনে জ্ঞান অর্জনের বিপুল সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ভুল তথ্য, ভিত্তিহীন দাবি এবং কুসংস্কারও বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে তথ্য যাচাই, প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

হোসেনের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শেখায়, কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে তথ্য বিশ্লেষণ করা এবং যুক্তির সাহায্যে সত্য যাচাই করা জরুরি। তাঁর সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ মনে করিয়ে দেয়, জ্ঞানের সঙ্গে মানবিকতা ও সংবেদনশীলতারও প্রয়োজন রয়েছে। আর মুক্তবুদ্ধির চর্চায় তাঁর অংশগ্রহণ দেখায়, সমাজের অগ্রগতির জন্য স্বাধীন চিন্তা অপরিহার্য।

তাঁকে স্মরণ করার অর্থ শুধু অতীতের একজন কৃতী ব্যক্তিকে শ্রদ্ধা জানানো নয়। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করতে হলে নিজেদেরও প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি প্রমাণ ও যুক্তিকে যথাযথ গুরুত্ব দিই? শিক্ষার্থীদের কি স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ দিই? জ্ঞানকে কি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য ব্যবহার করি, নাকি বৃহত্তর সমাজের কল্যাণেও কাজে লাগাই?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার মধ্য দিয়েই তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া সম্ভব। বিশেষ করে শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর কর্মজীবন অনুসন্ধিৎসা, অধ্যবসায় এবং জ্ঞানচর্চার প্রতি নিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

প্রজন্মের পর প্রজন্মে অমলিন থাকবেন জ্ঞানতাপস

খ্যাতি ও পদমর্যাদা সময়ের সঙ্গে ম্লান হয়ে যেতে পারে, কিন্তু মানুষের কল্যাণে নিবেদিত জ্ঞান ও মহৎ কর্ম দীর্ঘকাল বেঁচে থাকে। কাজী মোতাহার হোসেনের জীবন এই সত্যেরই প্রতিফলন।

বিজ্ঞানের সাধনা, পরিসংখ্যান শিক্ষার বিকাশ, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ এবং যুক্তিবাদী চিন্তার পক্ষে তাঁর অবস্থান তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে অনন্য মর্যাদা দিয়েছে। তাঁর অবদান স্মরণ করা মানে জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব স্বীকার করা এবং সমাজে স্বাধীন চিন্তার পরিবেশ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা।

তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানাতে হলে শুধু স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন সত্যের অনুসন্ধান, যুক্তির প্রতি সম্মান, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতন অবস্থান এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ থাকা। নতুন প্রজন্মের মধ্যে অনুসন্ধিৎসা ও স্বাধীন চিন্তার বিকাশ ঘটাতে পারলেই তাঁর আদর্শের যথার্থ প্রতিফলন ঘটবে।

কাজী মোতাহার হোসেন আজ আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তাঁর কর্ম ও চিন্তার উত্তরাধিকার রয়ে গেছে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, জ্ঞানের প্রকৃত সার্থকতা কেবল ব্যক্তিগত অর্জনে নয়; বরং সেই জ্ঞানকে সমাজের কল্যাণে কাজে লাগানোর মধ্যেই নিহিত।

জ্ঞানতাপস কাজী মোতাহার হোসেনের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র প্রণতি। তাঁর আলোকিত জীবন আগামী প্রজন্মকে জ্ঞানের পথে চলতে, সত্যকে ভালোবাসতে, যুক্তির চর্চা করতে এবং আরও মানবিক সমাজ গঠনে অনুপ্রাণিত করুক।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।