ভারতীয় নারী ক্রিকেট দলে নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘিরে অস্বস্তির খবর সামনে এসেছে। তিন ফরম্যাটের অধিনায়কত্ব থেকে হরমনপ্রীত কৌর সরে দাঁড়ানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন অধিনায়ক হিসেবে স্মৃতি মান্ধানার নাম ঘোষণা করা হয়। এরপরই দলের ভেতরে দুই তারকা ক্রিকেটারের সম্পর্ক এবং ড্রেসিংরুমের পরিবেশ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভারতীয় দলের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, হরমনপ্রীত ও স্মৃতি মান্ধানার মধ্যে বর্তমানে প্রায় কোনো যোগাযোগ নেই। সূত্রটির দাবি, এই দূরত্বের প্রভাব দলের পরিবেশেও পড়েছে এবং সতীর্থদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
পিটিআইকে ওই সূত্র বলেন, “এখন ওদের মধ্যে মুখ দেখাদেখি বন্ধ। ফলে দলের মধ্যেও একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।”
হরমনপ্রীত ও স্মৃতি—দুজনই দীর্ঘ সময় ধরে ভারতীয় নারী ক্রিকেটের গুরুত্বপূর্ণ মুখ। ব্যাট হাতে দলের সাফল্যে তাঁদের বড় অবদান রয়েছে। নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও দুজনের নাম বহুবার আলোচনায় এসেছে। ফলে একজনের জায়গায় অন্যজন অধিনায়ক হওয়ার পর ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েনের খবর সামনে আসায় বিষয়টি বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে।
দলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্মৃতি মান্ধানা বেশ কিছুদিন ধরেই নেতৃত্বের দায়িত্ব পাওয়ার প্রত্যাশায় ছিলেন। কিন্তু নির্বাচকেরা এত দিন হরমনপ্রীতের ওপরই আস্থা রেখেছেন। ভারতকে প্রথমবার আইসিসির কোনো ট্রফি জেতানো অধিনায়ক হিসেবে হরমনপ্রীতের অবস্থানও শক্ত ছিল। তাঁর নেতৃত্বে পাওয়া সেই সাফল্য নির্বাচকদের আস্থার বড় কারণ হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় ধরে নেতৃত্বের সুযোগ না পাওয়ায় স্মৃতি সন্তুষ্ট ছিলেন না বলে দাবি করা হয়েছে। প্রকাশ্যে এ নিয়ে তিনি খুব বেশি কিছু না বললেও বিষয়টি নিয়ে তাঁর ভেতরে ক্ষোভ ছিল বলে সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে পিটিআই।
পরিস্থিতির মোড় ঘোরে ভারতের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ অভিযান নকআউট পর্বে শেষ হওয়ার পর। প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার পর দলটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে নির্বাচকদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। ৩৭ বছর বয়সী হরমনপ্রীতের পরিবর্তে ভবিষ্যতের জন্য নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।
তবে শুরুতে হরমনপ্রীতকে একেবারে নেতৃত্বের বাইরে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল না। জানা গেছে, তাঁকে টেস্ট ও ওয়ানডে দলের অধিনায়ক রেখে শুধু টি-টোয়েন্টির নেতৃত্ব ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু হরমনপ্রীত সেই প্রস্তাবে সম্মতি দেননি। তিনি তিন ফরম্যাটের অধিনায়কত্ব থেকেই সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।
নির্বাচকেরা শেষ পর্যন্ত তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে নেন। এরপর অধিনায়ক হিসেবে স্মৃতি মান্ধানাকে বেছে নেওয়া হয়। ফলে ভারতীয় নারী ক্রিকেটের নেতৃত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে।
স্মৃতি দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সীমিত ওভারের ক্রিকেটের অন্যতম প্রধান ব্যাটার। তাঁকে অধিনায়ক করার সিদ্ধান্ত তাই শুধু বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া নয়, ভবিষ্যতের নেতৃত্ব কাঠামো তৈরির প্রচেষ্টাও হতে পারে। তবে নতুন দায়িত্বের সঙ্গে তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অধিনায়ক হিসেবে মাঠের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি তাঁকে দলের ভেতরের সমন্বয় এবং আস্থার পরিবেশ ধরে রাখতে হবে।
কারণ নেতৃত্ব পরিবর্তনের সময় শুধু অধিনায়ক বদলালেই কাজ শেষ হয় না। দলের সিনিয়র ক্রিকেটারদের সঙ্গে নতুন অধিনায়কের সম্পর্ক, ড্রেসিংরুমের পরিবেশ এবং খেলোয়াড়দের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে হরমনপ্রীতের মতো দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ক্রিকেটার একই দলে থাকলে নতুন অধিনায়কের সঙ্গে তাঁর সমন্বয় দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে হরমনপ্রীতের ভূমিকা নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অধিনায়কত্ব না থাকলেও তাঁর অভিজ্ঞতা ভারতীয় দলের জন্য মূল্যবান। অন্যদিকে, স্মৃতির নেতৃত্বের কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে তিনি সিনিয়র ও জুনিয়র ক্রিকেটারদের কতটা একসঙ্গে রাখতে পারেন তার ওপর।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে ভারতের বিদায়ের পর সাবেক অধিনায়ক মিতালি রাজও নেতৃত্ব পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, স্মৃতি মান্ধানাকে আরও দুই-তিন বছর আগেই ওয়ানডে দলের অধিনায়ক করা উচিত ছিল। মিতালির সেই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, ভারতীয় নারী ক্রিকেটে স্মৃতিকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী হিসেবে অনেক দিন ধরেই দেখা হচ্ছে।
এখন সেই দায়িত্বই তাঁর হাতে। ফলে সামনে শুধু ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স নয়, পুরো দলের নেতৃত্ব দেওয়ার পরীক্ষাও রয়েছে। নেতৃত্ব বদলের পর দলের ভেতরে যে অস্বস্তির কথা উঠে এসেছে, সেটি কতটা সাময়িক এবং মাঠের পারফরম্যান্সে তার কোনো প্রভাব পড়ে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। ভারতীয় নারী ক্রিকেটের জন্য নতুন অধ্যায়ের শুরুটা তাই শুধু নতুন অধিনায়ককে ঘিরে নয়, বরং দলের ঐক্য ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।









