,

নয়ীম গহর: মুক্তিযুদ্ধের গানে অমর এক সৃষ্টিশীল কণ্ঠ

একসময় তাঁর কণ্ঠে ছিল তারুণ্যের দীপ্তি, কথায় ছিল দৃঢ়তা আর সৃষ্টিতে ছিল সময়কে নাড়া দেওয়ার শক্তি। একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে তাঁর লেখা গান মানুষের মনে জাগিয়েছিল দেশপ্রেম, সাহস ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। মুক্তিযুদ্ধের সেই অগ্নিগর্ভ সময়ে তাঁর সৃষ্টিশীলতা হয়ে উঠেছিল সংগ্রামী মানুষের অনুপ্রেরণার অন্যতম ভাষা। অথচ জীবনের শেষদিকে সেই মানুষটিই ধীরে ধীরে সরে গিয়েছিলেন জনসমাগম ও প্রচারের আলো থেকে।

তিনি নয়ীম গহর—একাধারে গীতিকার, কবি, ঔপন্যাসিক, গায়ক, অভিনেতা, নাট্যকার, বিবিসির বাংলা ভাষ্যকার ও সংবাদ পাঠক। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি শুধু শিল্প-সাহিত্যের জগতেই নিজের ছাপ রাখেননি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে তাঁর সাহসী ভূমিকা।

১৯৩৬ সালের ১৫ আগস্ট বিক্রমপুর পরগনার একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নয়ীম গহরের। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন তিনি। সাহিত্যচর্চার সূচনাও ঘটে বেশ অল্প বয়সে। শুরুতে ইংরেজি ভাষায় কবিতা লিখতেন। তৎকালীন অন্যতম প্রধান ইংরেজি দৈনিক অবজারভার-এও তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়।

পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যেও নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন নয়ীম গহর। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘শব ও স্বগতোক্তি’ ও ‘নিষিদ্ধ বিছানা’। ‘রাহুগ্রাস’ তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ। বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অসংখ্য কবিতা ও ছোটগল্প।

তবে নিজের সৃষ্টিশীল কাজ সংরক্ষণের ব্যাপারে তিনি খুব একটা যত্নবান ছিলেন না। ফলে তাঁর বহু লেখা বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বিভিন্ন প্রকাশনা ও সংগ্রহে। একজন বহুমুখী স্রষ্টার বিশাল সাহিত্যকর্মের একটি অংশ এভাবেই সময়ের আড়ালে চলে গেছে।

তবে সাধারণ মানুষের কাছে নয়ীম গহরের সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয় গীতিকার হিসেবে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যখন চূড়ান্ত সংগ্রামের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন তাঁর লেখা দেশাত্মবোধক গান মানুষের মনে নতুন শক্তি সঞ্চার করেছিল। তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে আসে—‘নোঙর তোলো তোলো, সময় যে হলো হলো’, ‘সাগর পাড়িতে ঝড় জাগে যদি জাগতে দাও’, ‘পুবের ওই আকাশে সূর্য উঠছে আলোকে আলোকময়’, ‘জয় জয় জয় জয় বাংলা’ এবং ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো’র মতো গান।

এসব গান কেবল বিনোদনের জন্য রচিত হয়নি। একাত্তরের বাস্তবতায় দেশ, স্বাধীনতা, সংগ্রাম ও ভবিষ্যতের স্বপ্নকে ধারণ করে এগুলো মানুষের আবেগের সঙ্গে মিশে যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশাত্মবোধক গান সাধারণ মানুষের মধ্যে যে মনোবল ও জাতীয় চেতনা জাগিয়ে তুলেছিল, নয়ীম গহরের গান সেই সাংস্কৃতিক আবহের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততাও ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২৫ মার্চের ভয়াল রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযান ও গণহত্যার মধ্যে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে একটি জরুরি বার্তা গোপনে চট্টগ্রামে এম. আর. সিদ্দিকীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি। স্বাধীনতার বহু বছর পর মুক্তিযুদ্ধে তাঁর এই ভূমিকার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আসে। ২০১২ সালে তিনি দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন।

গীতিকার হিসেবে তাঁর সৃষ্টির পরিধিও ছিল বিস্তৃত। দেশাত্মবোধক গানের পাশাপাশি আধুনিক ও উচ্চাঙ্গসংগীতের জন্যও তিনি গান লিখেছেন। তাঁর রচিত গানের সংখ্যা প্রায় দুইশো বলে উল্লেখ করা হয়। প্রেম, প্রকৃতি, দেশ ও মানুষের অনুভূতি—বিভিন্ন বিষয় তাঁর গানের কথায় জায়গা পেয়েছে।

নাট্যকার হিসেবেও তাঁর ছিল আলাদা পরিচয়। স্বাধীন বাংলাদেশের পর তাঁর লেখা প্রথম নাটক ‘পাখি আমার জয়ন্ত’ বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়। ‘জয়ন্ত’ নামটি ছিল তাঁর নিজের ছেলের নাম থেকে নেওয়া।

টেলিভিশনের অনুষ্ঠান নির্মাণেও তাঁর সৃজনশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। সাংবাদিক ও উপস্থাপক ফজলে লোহানীর সঙ্গে মিলে তিনি ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানটি তৈরি করেছিলেন। সামাজিক অসংগতি, মানুষের আচরণ ও সমকালীন নানা বিষয়কে ভিন্নধর্মী উপস্থাপনার মাধ্যমে তুলে ধরার কারণে অনুষ্ঠানটি দর্শকদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। তাঁর লেখা জনপ্রিয় পঙ্‌ক্তি ছিল—

‘ইচ্ছে করেই যারা ভুল করেন,
জেনেও না জানার ভান করেন,
তাদের কিছু ভুল বুঝিয়ে দেব।’

অভিনয়েও নয়ীম গহরের আগ্রহ ও দক্ষতা ছিল। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম তাঁকে চলচ্চিত্রে নায়ক হওয়ার জন্য একাধিকবার উৎসাহিত করেছিলেন। সে সময়ের চলচ্চিত্র সাময়িকী রূপছায়া তাঁর ছবি প্রকাশ করে তাঁকে সম্ভাবনাময় মুখ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। কিন্তু চলচ্চিত্রের নায়ক হিসেবে দীর্ঘ ক্যারিয়ার গড়ে তোলার পথে তিনি এগিয়ে যাননি।

বরং তাঁর পরিচয় ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত হয়েছে। তিনি হয়ে উঠেছেন মুক্তিযুদ্ধের একজন অংশগ্রহণকারী, সৃষ্টিশীল সংস্কৃতিকর্মী এবং এমন একজন শিল্পী, যার গানের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের আবেগ জড়িয়ে আছে।

তবে জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল অনেকটাই নীরব। যে মানুষ একসময় গান, সাহিত্য, অভিনয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন, তিনি ক্রমে নিজেকে গুটিয়ে নেন। জনসমক্ষে তাঁর উপস্থিতি কমে আসে। নিজের সৃষ্টির জগত থেকেও তিনি অনেকটা দূরে সরে যান।

কেন এমন হয়েছিল, তার স্পষ্ট উত্তর হয়তো ইতিহাস দেয় না। স্বাধীনতার যে স্বপ্ন নিয়ে একটি প্রজন্ম সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, স্বাধীন দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সেই স্বপ্নের কতটা মিল হয়েছিল—এ প্রশ্ন তাঁর জীবনকে ঘিরেও ফিরে আসে। তবে তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতি বা অভিমানের বিষয়ে নিশ্চিতভাবে বলার মতো তথ্য না থাকায় অনুমানের জায়গা তৈরি করা ঠিক হবে না।

৭ অক্টোবর ২০১৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন নয়ীম গহর। তাঁর চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় এক বহুমুখী সৃষ্টিশীল জীবনের অধ্যায়। কিন্তু তাঁর লেখা গান, কবিতা, নাটক ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত স্মৃতি তাঁকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে আলাদা করে স্মরণীয় করে রেখেছে।

তাঁর সৃষ্টিশীল উত্তরাধিকারও পরবর্তী প্রজন্মে বহমান। তাঁর দুই কন্যা—সংগীতশিল্পী তাজরীন গহর এবং নাটক ও চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী ইলোরা গহর—নিজ নিজ ক্ষেত্রে কাজ করে চলেছেন।

নয়ীম গহর আজ নেই। নেই সেই মানুষটির কণ্ঠ, যিনি একসময় গান ও শব্দের মাধ্যমে একটি সংগ্রামী সময়ের আবেগকে ধারণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সৃষ্টির কিছু অংশ এখনও মানুষের মনে বেঁচে আছে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের গানগুলো তাঁকে বারবার ফিরিয়ে আনে বাংলাদেশের ইতিহাসের সেই উত্তাল অধ্যায়ে।

‘নোঙর তোলো তোলো,
সময় যে হলো হলো’—এই আহ্বান আজ শুধু একটি গানের পঙ্‌ক্তি নয়; এটি নয়ীম গহরের সৃষ্টিশীল জীবনেরও এক প্রতীক হয়ে আছে।

সময় অনেক মানুষকে আড়ালে নিয়ে যায়। কিন্তু কিছু কণ্ঠ সময় পেরিয়েও থেকে যায় মানুষের স্মৃতিতে। নয়ীম গহর তেমনই এক সৃষ্টিশীল মানুষ—যাঁর জীবন ও কর্ম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্য ও সংগীতের ইতিহাসে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার মতো।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।