আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি, প্রবাসী আয়, বিদেশে পড়াশোনা ও ভ্রমণ—সব ক্ষেত্রেই বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মার্কিন ডলারের দরের পরিবর্তন বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও আমদানি ব্যয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফলে প্রতিদিনের মুদ্রাবাজারের পরিস্থিতি ব্যবসায়ী, আমদানিকারক থেকে শুরু করে বিদেশগামী সাধারণ মানুষের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা ওঠানামা থাকলেও বর্তমানে ডলারের দর আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। কেন্দ্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক মাস আগে মার্কিন ডলারের দাম সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৮২ পয়সায় উঠেছিল। এখন তা কমে ১২২ টাকা ৯৭ পয়সায় লেনদেন হচ্ছে।
বাজারে চাহিদা অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ থাকলেও আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গত মাসে ধাপে ধাপে ডলারের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। এর ফলে টাকার বিপরীতে মার্কিন মুদ্রার মূল্য কিছুটা বেড়ে যায়। তবে পরবর্তী সময়ে বাজারের চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসায় ডলারের দর আবার কিছুটা কমেছে।
আজকের বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার
বাংলাদেশ ব্যাংক ও দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর ২০২৬ বিভিন্ন বৈদেশিক মুদ্রার সর্বনিম্ন বিনিময় হার হলো—
| মুদ্রার নাম | বাংলাদেশি টাকায় বিনিময় হার |
|---|---|
| ইউএস ডলার | ১২২ টাকা ৯৭ পয়সা |
| ইউরো | ১৩৮ টাকা ৪৩ পয়সা |
| পাউন্ড | ১৬৩ টাকা ২০ পয়সা |
| কানাডিয়ান ডলার | ৮৬ টাকা ৫৪ পয়সা |
| অস্ট্রেলিয়ান ডলার | ৮৫ টাকা ৮৫ পয়সা |
| চায়নিজ ইয়েন | ১৮ টাকা ৩৪ পয়সা |
| সিঙ্গাপুরি ডলার | ৯৬ টাকা ২৬ পয়সা |
| ভারতীয় রুপি | ১ টাকা ২৭ পয়সা |
| মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত | ৩০ টাকা ০৬ পয়সা |
| সৌদি রিয়াল | ৩২ টাকা ৭৬ পয়সা |
| কাতারি রিয়াল | ৩৩ টাকা ৭১ পয়সা |
| কুয়েতি দিনার | ৩৯৫ টাকা ৮৯ পয়সা |
| আরব আমিরাতের দিরহাম | ৩৩ টাকা ৪৫ পয়সা |
রেমিট্যান্সে ইতিবাচক প্রবাহের প্রভাব
বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতার পেছনে প্রবাসী আয়ের প্রবাহকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠালে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ে। এতে ডলারের ওপর অতিরিক্ত চাপ কিছুটা কমতে পারে এবং আমদানি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক লেনদেন পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বাড়ে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারিও বাজার ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আর্থিক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ ইতিবাচক থাকা এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে নিয়ন্ত্রণমূলক নজরদারি জোরদার হওয়ায় খোলাবাজার ও আনুষ্ঠানিক বাজারের বিনিময় হারের ব্যবধান আগের তুলনায় কমেছে।
ডলারের দর কমায় কারা স্বস্তিতে
ডলারের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে আমদানিকারকদের ওপর। বিদেশ থেকে পণ্য, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি কিংবা অন্যান্য উপকরণ আমদানির জন্য তখন একই পরিমাণ ডলার কিনতে বেশি টাকা প্রয়োজন হয়। আমদানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচ এবং শেষ পর্যন্ত বাজারদরের ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।
বর্তমানে ডলারের দর ১২৩ টাকা ৮২ পয়সার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ১২২ টাকা ৯৭ পয়সায় নেমে আসায় আমদানিকারকদের জন্য কিছুটা স্বস্তি তৈরি হয়েছে। তবে এই পরিবর্তন খুব বড় নয়। ফলে আমদানি ব্যয়ের ওপর এর প্রভাবও পণ্য ও লেনদেনের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
অন্যদিকে, বিদেশে পড়াশোনা, চিকিৎসা, ভ্রমণ কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা কিনতে হয় এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও বিনিময় হার গুরুত্বপূর্ণ। ডলারের পাশাপাশি ইউরো, পাউন্ড, কানাডিয়ান ও অস্ট্রেলিয়ান ডলারের মতো মুদ্রার দরও সংশ্লিষ্ট লেনদেনের মোট ব্যয় নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
বিনিময় হার কেন পরিবর্তিত হয়
বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার কোনো স্থির সংখ্যা নয়। বাজারে মুদ্রার চাহিদা ও সরবরাহ, আমদানি-রপ্তানি পরিস্থিতি, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মতো বিভিন্ন বিষয়ের প্রভাবে এ দর পরিবর্তিত হতে পারে। একই দিনে ব্যাংকভেদে বা লেনদেনের ধরন অনুযায়ীও কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে।
এ কারণে প্রকাশিত কোনো একটি হারকে সব ধরনের লেনদেনের জন্য চূড়ান্ত দর হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। বিদেশ থেকে অর্থ পাঠানো, বৈদেশিক মুদ্রা কেনা বা বিক্রি কিংবা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পরিশোধের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ দর জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
বর্তমানে ডলারের দাম কিছুটা কমে ১২২ টাকা ৯৭ পয়সায় আসায় ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার এখনও পরিবর্তনশীল। তাই আগামী দিনে ডলারসহ অন্যান্য মুদ্রার দর কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে বাজারের চাহিদা-জোগান, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং সামগ্রিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
নোট: এখানে উল্লেখিত বিনিময় হার ৭ অক্টোবর ২০২৬-এর তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার দর যেকোনো সময় পরিবর্তিত হতে পারে। বাস্তব লেনদেনের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ হার যাচাই করা উচিত।









