লিওনেল মেসির বার্সেলোনা অধ্যায়কে হয়তো এক কথায় বলা যায়—এসেছিলেন, দেখেছিলেন, জয় করেছিলেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের হয়ে তার পথচলা ছিল একেবারেই ভিন্ন। বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হওয়া সত্ত্বেও নিজের দেশের মানুষের নিঃশর্ত ভালোবাসা অর্জন করতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে বহু বছর। ছিল ব্যর্থতা, ছিল সমালোচনা, ছিল বড় মঞ্চে বারবার স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা।
একসময় সেই হতাশা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেই সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মেসি। ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়ে তিনি আর্জেন্টিনার ফুটবলপ্রেমীদের স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন। তবে সেই বিদায় স্থায়ী হয়নি। দেশের জার্সিতে ফিরে এসে মেসি শেষ পর্যন্ত এমন এক অধ্যায়ের সূচনা করেন, যার পরিণতি হয়েছে রূপকথার মতো।
ফিরে আসার পর আর্জেন্টিনার হয়ে একের পর এক সাফল্য পেয়েছেন তিনি। জিতেছেন দুটি কোপা আমেরিকা, একটি ফিনালিসিমা এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপ। বিশেষ করে কাতার বিশ্বকাপের শিরোপা ছিল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতার অবসান। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর সেই ট্রফি হাতে তুলে নেওয়ার মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায় তার জাতীয় দলের গল্প।
তাই বিদায়ের মুহূর্তটিও হচ্ছে বিশেষ। আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ ম্যাচ ঘিরে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে আবেগঘন পরিবেশ। ঐতিহাসিক মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বিপুলসংখ্যক দর্শক তাকে শেষবারের মতো জাতীয় দলের হয়ে মাঠে দেখতে উপস্থিত থাকবেন। এই ম্যাচ ঘিরে মানুষের আগ্রহ কতটা, সেটি বোঝা যায় কোচ লিওনেল স্কালোনির মন্তব্যেও। মেসির বিদায়ী ম্যাচের জন্য তিনটি স্টেডিয়ামের টিকিটও বিক্রি করা যেত বলে জানিয়েছেন তিনি।
মেসির জন্মশহর রোজারিওতেও বিদায়ের আবহ স্পষ্ট। শহরের ন্যাশনাল ফ্ল্যাগ মনুমেন্টে মেসির প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। বিশাল ১০ নম্বর জার্সির আদলে সাজানো সেই আয়োজনে সোনালি অক্ষরে লেখা হয়েছে—‘ধন্যবাদ’।
একটি মাত্র শব্দ। কিন্তু মেসির প্রতি আর্জেন্টিনার মানুষের অনুভূতি প্রকাশের জন্য সেটিও যেন যথেষ্ট নয়। যে খেলোয়াড় একসময় জাতীয় দলের হয়ে শিরোপা জিততে না পারায় সমালোচিত হয়েছেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই দেশের ফুটবলকে এনে দিয়েছেন একাধিক বড় ট্রফি। ব্যর্থতার সেই সময়গুলো এখন যেন তার সাফল্যের গল্পেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিদায়ের আগে মেসি নিজেও আবেগ সামলাতে পারছেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি জানিয়েছেন, জীবনের বিশেষ কিছু মুহূর্ত তিনি ভবিষ্যতে খুব মিস করবেন। তার এই অনুভূতি ভক্তদের আবেগকে আরও গভীর করেছে। মাঠে কঠিন পরিস্থিতিতেও যিনি সাধারণত ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেন, বিদায়ের মুহূর্তে সেই মেসির কণ্ঠেও যেন বিষণ্ণতার সুর।
আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই তারকার বিদায় শুধু আর্জেন্টিনার জন্য নয়, বিশ্ব ফুটবলের জন্যও একটি বড় ঘটনা। প্রায় দুই দশকের ক্যারিয়ারে মেসি অসংখ্য রেকর্ড গড়েছেন, ব্যক্তিগত পুরস্কার জিতেছেন এবং ক্লাব ও দেশের হয়ে ইতিহাসের অংশ হয়েছেন। তবে জাতীয় দলের হয়ে তার যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল প্রত্যাবর্তনের গল্প।
একসময় সমালোচনার মুখে থাকা সেই মেসিই পরে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হিসেবে কোপা আমেরিকা জিতেছেন, ফিনালিসিমা জিতেছেন এবং সবশেষে বিশ্বকাপ হাতে তুলেছেন। ফলে তার বিদায়কে শুধু একটি ম্যাচের সমাপ্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আর্জেন্টিনার ফুটবলের একটি দীর্ঘ ও আবেগঘন অধ্যায়ের শেষ দৃশ্য।
মনুমেন্তালের গ্যালারিতে যারা থাকবেন, তারা হয়তো শেষবারের মতো মেসির ড্রিবলিং, নিখুঁত পাস কিংবা গোলের অপেক্ষায় থাকবেন। আর বিশ্বের কোটি কোটি সমর্থক টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখবেন সেই একই প্রত্যাশা নিয়ে। ম্যাচের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেদিন মাঠের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে আবেগ।
রোজারিওর ছোট্ট ছেলে থেকে বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকা হয়ে ওঠার এই যাত্রায় ছিল অনেক উত্থান-পতন। ছিল অপূর্ণতার দীর্ঘ অপেক্ষা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই গল্পে এসেছে পূর্ণতা।
জাতীয় দলের জার্সি একদিন তুলে রাখতেই হয়। মেসির ক্ষেত্রেও সেই মুহূর্ত এসে গেছে। শেষ বাঁশির পর মাঠ থেকে তিনি সরে যাবেন, কিন্তু আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে তার জায়গা থাকবে অমলিন।
আর সেই বিদায়ের রাতে, স্টেডিয়ামের গর্জনের সঙ্গে হয়তো একটাই শব্দ বারবার ফিরে আসবে—‘গ্রাসিয়াস, মেসি।’









