প্যারিসে নেশন্স লিগের ম্যাচে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখল ফ্রান্স। ম্যাচের ৭৬ মিনিট পর্যন্ত বেলজিয়ামের বিপক্ষে ১-০ গোলে পিছিয়ে ছিল তারা। কিন্তু শেষ ১৪ মিনিটে চার গোলের ঝড় তুলে ম্যাচের পুরো চিত্র পাল্টে দেয় স্বাগতিকরা। শেষ পর্যন্ত বেলজিয়ামকে ৪-১ গোলে হারিয়ে মাঠ ছাড়ে ফ্রান্স। এমন অসাধারণ জয়ের পর উচ্ছ্বাস লুকাতে পারেননি কোচ জিনেদিন জিদান। তাঁর ভাষায়, ‘এটাই ফুটবল, এটাই আমরা ভালোবাসি।’
সোমবারের ম্যাচে শুরু থেকেই আক্রমণের নিয়ন্ত্রণ ছিল ফ্রান্সের হাতে। বল দখলে রেখে একের পর এক আক্রমণ তৈরি করছিল স্বাগতিকরা। বেলজিয়ামের রক্ষণভাগের ওপর চাপ থাকলেও সেই চাপকে গোলে পরিণত করতে পারছিল না ফরাসি ফরোয়ার্ডরা। বেশ কয়েকটি সুযোগ তৈরি হলেও শেষ মুহূর্তে ভুল হচ্ছিল। এস্তেবান লুপলও পাওয়া সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি।
ফ্রান্স যখন গোলের জন্য মরিয়া হয়ে আক্রমণ করছিল, তখন সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে উঠছিল বেলজিয়াম। সেই কৌশল থেকেই ৩৫তম মিনিটে এগিয়ে যায় তারা। দ্রুত আক্রমণের পর দদি লুকেব্যাকিওর গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে বিরতিতে যায় বেলজিয়াম।
দ্বিতীয়ার্ধে ফ্রান্সের চাপ আরও বাড়ে। আক্রমণের পর আক্রমণ হলেও গোলের দেখা পাচ্ছিল না তারা। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ম্যাচটি ফ্রান্সের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠছিল। তখনই আক্রমণভাগে একসঙ্গে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেন জিদান।
৬০তম মিনিটে মাইকেল ওলিসে, লুকা দা কুনা ও রায়ান শের্কিকে মাঠে নামান ফরাসি কোচ। এরপর ৭২তম মিনিটে মাঠে আসেন দেজিরে দুয়ে। বদলির পর ফ্রান্সের আক্রমণে গতি বাড়ে, আর তার ফলও আসে দ্রুত।
৭৭তম মিনিটে ফ্রান্সকে সমতায় ফেরান দুয়ে। গোল পাওয়ার পর স্বাগতিকদের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়। মাত্র চার মিনিট পর রায়ান শের্কির গোলে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ফ্রান্স। মুহূর্তের মধ্যে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে তাদের হাতে।
এরপর বেলজিয়ামের রক্ষণভাগ আর চাপ সামলাতে পারেনি। ৮৮তম মিনিটে নিজের প্রথম গোল করেন মাইকেল ওলিসে। যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে আবারও জালের দেখা পান তিনি। ফলে মাত্র ১৪ মিনিটের মধ্যে চার গোল করে ফ্রান্স ৪-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে।
একসময় যে ম্যাচে হারের শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় বড় ব্যবধানের জয়ে। ফ্রান্সের এই প্রত্যাবর্তনের কেন্দ্রে ছিলেন বদলি হিসেবে মাঠে নামা খেলোয়াড়েরা। তবে জিদান কৃতিত্ব শুধু তাঁদের দিতে চাননি।
ম্যাচ শেষে ফরাসি কোচ বলেন, প্রথমার্ধে কিছু সমস্যায় পড়লেও বিরতির পর দল নিজেদের ভুলগুলো ঠিক করে দ্রুত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
“আজ রাতে যা হলো, এটাই ফুটবল, এটাই আমরা ভালোবাসি। প্রথমার্ধে আমরা কিছু সমস্যায় পড়েছিলাম। কিন্তু সেসব খেলারই অংশ। এমন ম্যাচ মাঝেমধ্যে এরকম হয়।”
দ্বিতীয়ার্ধের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট জিদান আরও বলেন, “ভুলের পর সবকিছু শুধরে নেওয়া সবসময়ই ভালো এবং আমরা অসাধারণ এক দ্বিতীয়ার্ধে ঠিক সেটাই করেছি। প্রথমার্ধে আমরা স্রেফ অল্পের জন্য বারবার পারিনি। কিন্তু পরে আমরা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছি, যা ছিল দারুণ।”
দলের ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে বদলি খেলোয়াড়দের প্রভাব স্বীকার করেছেন জিদান। দুয়ে সমতা ফেরান, শের্কি দলকে এগিয়ে দেন এবং ওলিসে জোড়া গোল করে জয় নিশ্চিত করেন। কিন্তু ফরাসি কোচের দৃষ্টিতে এটি কোনো ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ফল নয়; পুরো দলের সম্মিলিত পারফরম্যান্সই বড় হয়ে উঠেছে।
“আমরা জানতাম বদলি ফুটবলাররা খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তারা উঁচুমানের ফুটবলার। কিন্তু আবারও বলছি, এটি ছিল সম্পূর্ণ দলীয় পারফরম্যান্স। যদিও বদলি ছেলেরা মাঠে নেমে পার্থক্য গড়ে দিয়েছে, তবে গত দুই সপ্তাহ ধরেই সবাই ভালো খেলেছে—প্রত্যেকেই নিজের ভূমিকা পালন করেছে এবং এটাই আমার কাছে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য।”
বেলজিয়ামের বিপক্ষে এই জয়ের ফলে ‘এ-১’ গ্রুপে ফ্রান্সের অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে। চার ম্যাচে তাদের সংগ্রহ ১০ পয়েন্ট। এর মধ্যে বেলজিয়ামের বিপক্ষে দুটি জয়, তুরস্কের বিপক্ষে একটি জয় এবং ইতালির বিপক্ষে একটি ড্র রয়েছে। সমান চার ম্যাচে ৭ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছে ইতালি।
জয়ের অন্যতম নায়ক মাইকেল ওলিসেও দলীয় প্রচেষ্টার কথাই বলেছেন। তাঁর মতে, জিদানের দেওয়া নতুন ধারণা ও পরিকল্পনা খেলোয়াড়েরা মাঠে ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারছেন বলেই ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল আসছে।
ওলিসে বলেন, “এটা ছিল সম্মিলিত প্রচেষ্টা। তিনি (জিদান) নতুন ধারণা নিয়ে আসেন, আমরা সেগুলো অনুসরণ করি—গত চারটি ম্যাচে আমরা এটা ভালোভাবে করেছি এবং এভাবেই চালিয়ে যাব।”
বেলজিয়ামের বিপক্ষে ফ্রান্সের এই জয় তাই শুধু তিন পয়েন্টের হিসাব নয়। ৭৬ মিনিট পর্যন্ত পিছিয়ে থাকার পরও শেষ মুহূর্তে নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে যেভাবে ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দিয়েছে তারা, সেটিই জিদানের দলের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। চার গোলের এই প্রত্যাবর্তন একই সঙ্গে গ্রুপের শীর্ষস্থান আরও মজবুত করেছে এবং দলের আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়ে দিয়েছে।









