কলম ছিল তাঁর লড়াইয়ের প্রধান হাতিয়ার আর সত্য প্রকাশ ছিল তাঁর শক্তি। কোনো ধরনের ভয়, প্রলোভন বা নীরবতার কাছে যিনি কখনো নতি স্বীকার করেননি, তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণ সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসে তিনি এক অবিচল ও শ্রদ্ধেয় নাম। তিনি কেবল সংবাদ সম্পাদনার মধ্যেই নিজের ভূমিকা সীমাবদ্ধ রাখেননি; দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর জীবনের বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে আছে খুলনার আঞ্চলিক সাংবাদিকতার বিকাশ ও স্বাধিকার আন্দোলনের নানা গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস।
১৯৪৭ সালের ৪ অক্টোবর গোপালগঞ্জের বড়ফা গ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী সরদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ুন কবীর বালু। ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হন এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কারণে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়েছিল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সরাসরি অংশ নেন এবং দেশকে শত্রুমুক্ত করতে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। স্বাধীনতার পর যখন খুলনা শহরে লাল-সবুজের প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল, সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সঙ্গেও তাঁর নাম গভীরভাবে যুক্ত রয়েছে। স্বাধীনতার মূল চেতনা ও মূল্যবোধকে তিনি সারাজীবন হৃদয়ে ধারণ করেছেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। খুলনা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় দৈনিক ‘জন্মভূমি’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তিনি। তাঁর দূরদর্শী ও সাহসী সম্পাদনায় পত্রিকাটি খুলনা শহরসহ পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মেহনতি মানুষ ও সচেতন সমাজের মূল মুখপত্রে পরিণত হয়। খুলনা অঞ্চলের সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষা ও পেশাগত মান উন্নয়নেও তাঁর অবদান ছিল অপরিসীম। তিনি তিন মেয়াদে—১৯৮৪, ১৯৯৮ এবং ২০০৩ সালে ঐতিহ্যবাহী খুলনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত হন। এছাড়া ১৯৯০ সালে খুলনা জোনাল নিউজপেপার এডিটরস অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি এবং ১৯৯৮ সালে মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সাংবাদিকতার বাইরেও তাঁর এক উজ্জ্বল রাজনৈতিক পরিচয় ছিল। স্বাধীনতার আগেই রাজনীতির মাঠে সক্রিয় বালু ১৯৭৬ সালে খুলনা শহর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বহু সম্মাননায় ভূষিত হন। ১৯৯২ সালে পান ঐতিহাসিক ‘রাষ্ট্রপতি পুরস্কার’ এবং ১৯৯৩ সালে তাঁকে দেওয়া হয় ‘ড. আশরাফ সিদ্দিকী ফাউন্ডেশন স্বর্ণপদক’। সাংবাদিকতায় অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালে তাঁকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’ (মরণোত্তর)-এ ভূষিত করে।
২০০৪ সালের ২৭ জুন—দিনটি দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সংবাদমাধ্যমের জন্য ছিল এক কালো দিন। খুলনা শহরের ব্যস্ত এলাকা শান্তিধাম মোড়ে নিজের অফিস ও বাসভবনের সামনে পৌঁছালে দুর্বৃত্তরা তাঁকে লক্ষ্য করে শক্তিশালী বোমা হামলা চালায়। মারাত্মক আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে অস্ত্রোপচার চলাকালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৫৬ বছর। মৃত্যুর সেই দিনটিতে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছিল। মেয়ে এসএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়ায় আনন্দ ভাগ করে নিতে তিনি মায়ের জন্য মিষ্টি নিয়ে পৈতৃক ভিটায় গিয়েছিলেন। স্বজনদের সঙ্গে সেই আনন্দের মুহূর্ত কাটিয়ে ঘরে ফেরার পথেই ঘাতকরা তাঁর প্রাণ প্রদীপ নিভিয়ে দেয়।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড কেবল একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি ছিল না, বরং তা ছিল দেশের মুক্ত সাংবাদিকতা ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পরিবেশনের ওপর এক বড় আঘাত। বালু হত্যার পর সারা দেশের সংবাদকর্মী ও সাধারণ মানুষ বিচারের দাবিতে রাজপথে নেমে আসে। পরবর্তী সময়ে এই সংক্রান্ত বিচার প্রক্রিয়ায় পাঁচ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলেও সাংবাদিক সমাজ ও তাঁর স্বজনরা এই রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তাঁদের মতে, মূল নির্দেশদাতা ও নেপথ্যের কারিগররা বিচারপ্রক্রিয়ার বাইরে রয়ে গেছে। ২০২৬ সালেও তাঁর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীর বিভিন্ন স্মরণসভায় এই হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ পুনঃতদন্তের দাবি সোচ্চার রয়েছে।
আজ ৪ অক্টোবর, তাঁর জন্মদিনে তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে দেশ। ঘাতকের বোমায় তাঁর দেহাবসান ঘটলেও সত্য প্রকাশের যে সাহস ও আদর্শ তিনি রেখে গেছেন, তা আজও বর্তমান প্রজন্মের সাংবাদিকদের অনুপ্রাণিত করে। হুমায়ুন কবীর বালু সশরীরে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু সত্যের পক্ষে তাঁর লেখনী ও ত্যাগ বাংলাদেশের









