,

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেনে বড় উত্থান

সংস্কার উদ্যোগ, বিনিয়োগের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং পুঁজিবাজারের অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট লেনদেন হয়েছে ৩ হাজার ৭০১ কোটি ২৮ লাখ ৯৭ হাজার ৮৯৮ টাকা। গত বছরের একই সময়ে এ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৬৮৭ কোটি ৩৯ লাখ ৪৭ হাজার ৮০৯ টাকা।

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রথম আট মাসে বিদেশি লেনদেন বেড়েছে ১ হাজার ১৩ কোটি ৮৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা, যা শতাংশের হিসাবে ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-আগস্টের লেনদেন ইতোমধ্যে ২০২৫ সালের পুরো বছরের মোট বিদেশি লেনদেনের প্রায় ৯৪ শতাংশে পৌঁছে গেছে। গত বছর বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট লেনদেন ছিল ৩ হাজার ৯২০ কোটি ৪২ লাখ ২০ হাজার ২১ টাকা।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকেই বিদেশি লেনদেনে মাসভেদে বেশ ওঠানামা ছিল। জানুয়ারিতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩৭৭ কোটি ২৩ লাখ ৮৩ হাজার ৪৬৬ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ৬৬৩ কোটি ২৭ লাখ ৮০ হাজার ৭৯৫ টাকায় ওঠে। তবে মার্চে লেনদেন কমে দাঁড়ায় ২৭২ কোটি ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৯৮০ টাকা এবং এপ্রিলে আরও কমে হয় ১৭৫ কোটি ১৫ লাখ ৮৭ হাজার ৪৬০ টাকা।

এরপর মে মাসে বিদেশি লেনদেনে বড় ধরনের উত্থান দেখা যায়। ওই মাসে লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৩১ কোটি ৬৯ লাখ ৯০ হাজার ৭৭১ টাকা, যা চলতি বছরের প্রথম আট মাসের সর্বোচ্চ। জুনে লেনদেন হয় ৫৪০ কোটি ১৬ লাখ ৬১ হাজার ৪৭০ টাকা এবং জুলাইয়ে ৫২৩ কোটি ১৪ লাখ ৫২ হাজার ৯৬৬ টাকা। আগস্টে কিছুটা কমে বিদেশি লেনদেন দাঁড়ায় ৩১৮ কোটি ৫৭ লাখ ২৭ হাজার ৯৯১ টাকা।

গত বছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে চলতি বছরের প্রবৃদ্ধির চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বিদেশি লেনদেন ছিল ১৮১ কোটি ৮১ লাখ ৫ হাজার ১০৫ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে ২৬৪ কোটি ১৩ লাখ ৯৯ হাজার ২৬২ টাকা হলেও মার্চে কমে হয় ১৭১ কোটি ৯৬ লাখ ১৭ হাজার ৭৮৭ টাকা। এপ্রিল ও মে মাসে আবার ঊর্ধ্বমুখী হয় লেনদেন। এপ্রিলে ৪২৬ কোটি ৯৪ লাখ ১ হাজার ২৯৮ টাকা এবং মে মাসে ৫০৬ কোটি ৭৪ লাখ ১৯ হাজার ১৪২ টাকা লেনদেন হয়।

জুনে গত বছরের বিদেশি লেনদেন কমে ২৮৫ কোটি ৩০ লাখ ৭৭ হাজার ৬১৯ টাকায় নেমে এলেও জুলাইয়ে তা আবার বেড়ে ৪৯১ কোটি ৪৩ লাখ ৬৬ হাজার ২১৭ টাকা হয়। আগস্টে লেনদেন ছিল ৩৭১ কোটি ৫৬ লাখ ৩ হাজার ৫৪৮ টাকা। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে বিদেশি লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ২ হাজার ৬৮৭ কোটি ৩৯ লাখ ৪৭ হাজার ৮০৯ টাকা।

বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার পেছনে বাজার সংস্কারের বিভিন্ন উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে ‘ফ্রন্টিয়ার মার্কেট’ থেকে ‘এমার্জিং মার্কেট’-এ উন্নীত করার প্রস্তুতি, আন্তর্জাতিক সূচক নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ, বিদেশি বিনিয়োগের আনুষ্ঠানিকতা সহজ করা এবং লেনদেন নিষ্পত্তির সময় কমিয়ে আনার উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি করছে।

ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ারের মতে, বিদেশি লেনদেন বৃদ্ধির পেছনে কোনো একটি উদ্যোগকে এককভাবে দায়ী করা যায় না। বাজারের সামগ্রিক সংস্কার, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিনিয়োগ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন বাধা কমানোর উদ্যোগ একসঙ্গে কাজ করছে।

তিনি জানান, বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নন-রেসিডেন্ট ইনভেস্টরস টাকা অ্যাকাউন্ট বা এনআইটিএ ব্যবস্থার একটি জটিলতা সম্প্রতি সহজ করা হয়েছে। আগে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পর প্রতিটি লেনদেনের সময় এনআইটিএ হিসাবের মাধ্যমে অর্থের হিসাব-নিকাশ করতে হতো। বিষয়টি ডিএসইর পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরার পর নিয়মটি সহজ করা হয়েছে।

নতুন ব্যবস্থায় বিদেশি বিনিয়োগকারীকে প্রতিটি লেনদেনের সময় আলাদাভাবে ওই হিসাব সম্পন্ন করতে হবে না। বাংলাদেশ থেকে অর্থ প্রত্যাবাসনের সময় প্রয়োজনীয় হিসাব সম্পন্ন করার সুযোগ থাকায় বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা তুলনামূলক সহজ হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য এ ধরনের প্রক্রিয়াগত সরলীকরণ বাজারে প্রবেশ ও বিনিয়োগ পরিচালনার খরচ এবং জটিলতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।

একই সঙ্গে টি+১ সেটেলমেন্ট ব্যবস্থায় যাওয়ার উদ্যোগও বাজারের দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বর্তমানে কোনো শেয়ার কেনাবেচার পর লেনদেন নিষ্পত্তিতে যে সময় লাগে, তা কমানো গেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাজারের কার্যকারিতা আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

চলতি বছরের পরিসংখ্যান অবশ্য এটাও দেখাচ্ছে যে বিদেশি বিনিয়োগ এখনো ধারাবাহিক গতিতে বাড়ছে না; মাসভেদে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা রয়েছে। ফেব্রুয়ারি ও মে মাসে বড় লেনদেন হলেও মার্চ, এপ্রিল ও আগস্টে তা তুলনামূলক কম ছিল। তাই সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে বাজারের তারল্য, বিনিয়োগকারীদের আস্থা, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং বিদেশি বিনিয়োগের প্রক্রিয়াগত সুবিধাগুলো ধারাবাহিকভাবে নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

ডিএসইর হিসাবে, মাত্র আট মাসেই গত বছরের পূর্ণ বছরের বিদেশি লেনদেনের প্রায় ৯৪ শতাংশ সম্পন্ন হওয়া বাজারের প্রতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। তবে এই প্রবণতা কতটা স্থায়ী হয়, তা নির্ভর করবে সংস্কার কার্যক্রমের বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ পরিবেশের স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য বাজারের প্রবেশ ও অর্থ প্রত্যাবাসন কতটা সহজ রাখা যায় তার ওপর।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।