এশিয়ান গেমসে ক্রিকেটে পদক জয়ের স্বপ্ন পূরণ হয়নি বাংলাদেশের। মাঠের ব্যর্থতার সেই হতাশার মধ্যেই এবার আলোচনায় এসেছে দলের শৃঙ্খলা। টিম ম্যানেজমেন্টকে না জানিয়ে জাপানে এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে জাতীয় দলের তিন ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে। তারা হলেন সাইফ হাসান, তাওহীদ হৃদয় ও রিশাদ হোসেন। অভিযোগের পর তাদের আর্থিক শাস্তির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সূত্রের বরাতে একাধিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি, শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তিন ক্রিকেটারের প্রত্যেককে ১ লাখ থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট ক্রিকেটারদের বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত শাস্তির পরিমাণ ও বিসিবির আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
এশিয়ান গেমসে এবার বড় প্রত্যাশা নিয়েই জাপানে গিয়েছিল বাংলাদেশ। আগের আসরে ক্রিকেট থেকে ব্রোঞ্জ পদক পাওয়া দলটির লক্ষ্য ছিল এবার আরও ভালো ফল করা। স্বর্ণপদকের আশায় দল সাজানো হলেও টুর্নামেন্টে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যায়নি। বাংলাদেশের নেতৃত্বে ছিলেন লিটন দাস। ১৫ সদস্যের দলে ছিলেন সাইফ হাসান, তাওহীদ হৃদয় ও রিশাদ হোসেনও।
টুর্নামেন্টের শুরুটাও বাংলাদেশের জন্য কিছুটা অস্বাভাবিক ছিল। কোয়ার্টার ফাইনালে মালয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি বৃষ্টির কারণে মাঠে গড়ায়নি। র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকার সুবিধায় বাংলাদেশ সরাসরি সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয়। সেখানে পাকিস্তানের বিপক্ষে বড় ব্যবধানে হেরে যায় লিটন দাসের দল। ফলে স্বর্ণপদকের লড়াই থেকে ছিটকে গিয়ে তাদের খেলতে হয় তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে।
ব্রোঞ্জ পদকের সেই লড়াইয়েও বাংলাদেশ নিজেদের সামর্থ্যের কাছাকাছি ক্রিকেট খেলতে পারেনি। শ্রীলঙ্কার তুলনামূলক দুর্বল দলটির বিপক্ষে মাত্র ১০২ রানে অলআউট হয়ে যায় বাংলাদেশ। জবাবে শ্রীলঙ্কা ৬৩ রানের বড় ব্যবধানে জয় তুলে নেয়। এর ফলে এশিয়ান গেমসের ক্রিকেটে এবার কোনো পদক ছাড়াই ফিরতে হয় বাংলাদেশকে।
তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে বাংলাদেশের ব্যাটিং ব্যর্থতার তালিকায় ছিলেন সাইফ হাসান ও তাওহীদ হৃদয়ও। তবে ম্যাচের ফলের পাশাপাশি তাদের নিয়ে পরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় ভিন্ন একটি ঘটনায়।
বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সাইফ, হৃদয় ও রিশাদ দলের নির্ধারিত অবস্থান থেকে অন্য শহরে গিয়েছিলেন। অভিযোগের মূল বিষয় হলো, এই যাত্রার আগে তারা টিম ম্যানেজমেন্টের অনুমতি নিয়েছিলেন কি না। বিসিবির সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে দলের শৃঙ্খলাবিধির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।
তবে ঘটনাটি নিয়ে সব প্রতিবেদনে একই তথ্য পাওয়া যায়নি। জাপানে অবস্থানরত সাংবাদিকদের উদ্ধৃত করে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই দিন বাংলাদেশ দলের অনুশীলন ছিল না। তিন ক্রিকেটার খাবারের উদ্দেশ্যে পাশের শহরে গিয়েছিলেন এবং একই দিন টিম হোটেলে ফিরে আসেন। ফলে তারা দলের কোনো নির্ধারিত অনুশীলন বা ম্যাচ প্রস্তুতি বাদ দিয়ে বাইরে গিয়েছিলেন—এমন তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে না।
এখানেই অনুমতি ও অবগতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনুশীলন না থাকলেও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে দলের খেলোয়াড়দের চলাফেরা সাধারণত টিম ম্যানেজমেন্টের নির্ধারিত পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করেই করতে হয়। বিদেশের মাটিতে অবস্থান করার কারণে যাতায়াত, নিরাপত্তা, সময়সূচি এবং খেলোয়াড়দের উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও ব্যবস্থাপনার অংশ।
তিন ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে তাই মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—তারা ম্যানেজমেন্টের অনুমতি নিয়েছিলেন কি না এবং দলের নির্ধারিত নিয়ম কী ছিল। প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে এ বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য থাকায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে বিসিবির আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিসিবির সূত্রের বরাতে জানা গেছে, অভিযোগের পর তিন ক্রিকেটারকেই আর্থিক জরিমানার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। প্রত্যেকের জরিমানার পরিমাণ ১ লাখ থেকে ২ লাখ টাকার মধ্যে হতে পারে। এরই মধ্যে বিষয়টি খেলোয়াড়দের জানানো হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া ক্রিকেটারদের জন্য শৃঙ্খলা ও দলীয় নিয়ম মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে একটি দল যখন দেশের বাইরে কোনো বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়, তখন খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত চলাফেরার সঙ্গেও দলের নিরাপত্তা ও সময়সূচির বিষয়টি যুক্ত থাকে। সে কারণে অনুশীলন না থাকা দিনেও টিম ম্যানেজমেন্টকে না জানিয়ে অন্য শহরে যাওয়া কর্তৃপক্ষের কাছে শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বাংলাদেশের এশিয়ান গেমস অভিযান শেষ পর্যন্ত তাই মাঠ ও মাঠের বাইরে—দুই জায়গাতেই হতাশার জন্ম দিয়েছে। পদক জয়ের লক্ষ্য নিয়ে জাপানে যাওয়া দলটি শেষ পর্যন্ত কোনো পদক পায়নি। এর সঙ্গে তিন ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে ওঠা শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ যোগ হওয়ায় সফরের শেষটা আরও আলোচনামুখর হয়ে উঠেছে।
এখন অপেক্ষা বিসিবির আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের। তিন ক্রিকেটারের ব্যাখ্যা, ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি এবং টিম ম্যানেজমেন্টের অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে বোর্ড শেষ পর্যন্ত কী শাস্তি দেয়, সেটিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।









