রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় ফুটপাতের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় চারটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় মোট প্রায় দুই হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০ জনের নাম উল্লেখ রয়েছে। ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে অন্তত একজন এজাহারভুক্ত আসামি।
বৃহস্পতিবার পুলিশ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, সংঘর্ষের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে ভিডিও ফুটেজ, ছবি ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। ঘটনার পর আটক ব্যক্তিদের পরিচয় এবং সহিংসতায় তাঁদের সম্পৃক্ততা যাচাই করে গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে।
মামলাগুলোর তিনটি হয়েছে মিরপুর মডেল থানায় এবং একটি কাফরুল থানায়। মিরপুর মডেল থানায় করা দুটি মামলার বাদী পুলিশ। অপর মামলাটির বাদী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) একজন কর্মকর্তা। কাফরুল থানায় করা মামলাটিও ডিএনসিসির পক্ষ থেকে করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চার মামলার প্রতিটিতে ৫০০ জন করে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই অজ্ঞাতনামা। মামলাগুলোতে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা, তাঁদের আহত করা, সরকারি কাজে বাধা, পুলিশের গাড়ি ও ট্রাফিক পুলিশ বক্স ভাঙচুর এবং সরকারি সম্পত্তির ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছে। ডিএনসিসির পক্ষ থেকে করা মামলায় সিটি করপোরেশনের গাড়িতে আগুন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান জানান, ঘটনার পর ৩০ জনকে আটক করা হয়েছিল। পরে যাচাই-বাছাই শেষে পাঁচজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বাকি ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে তাঁর থানায় করা মামলার একজন এজাহারভুক্ত আসামিও রয়েছেন।
কাফরুল থানার ওসি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, তাঁর থানায় ডিএনসিসির একজন কর্মকর্তার বাদী হয়ে গাড়ি পোড়ানোর অভিযোগে মামলা হয়েছে। তবে ওই মামলায় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
যেভাবে সংঘর্ষের সূত্রপাত
ঘটনার সূত্রপাত হয় বুধবার সকালে। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে হোপ মার্কেটের দিকে ফুটপাত দখলমুক্ত করার জন্য উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে ডিএনসিসি। অভিযানে সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও ছিলেন।
অভিযানের একপর্যায়ে বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদ মার্কেটের নিচে থাকা দোকান ও ভাসমান স্থাপনা সরানোর সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের উদ্ধৃত করে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থাপনা সরানোর সময় বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে আগুন লাগার ঘটনাও ঘটে। এরপর হকারদের সঙ্গে উচ্ছেদকারী দলের সদস্যদের বিরোধ ও ধাক্কাধাক্কি থেকে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
একপর্যায়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে মিরপুর-১০ গোলচত্বরের আশপাশে। ডিএনসিসির অন্তত তিনটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশের একটি গাড়ি, একটি ভেকু ও কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুরের শিকার হয়। পরিস্থিতির মধ্যে কয়েকজন পুলিশ সদস্য এবং গণমাধ্যমকর্মীও হামলার শিকার হন।
সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। ঘটনার কারণে মিরপুর-১০ এলাকায় কিছু সময়ের জন্য স্বাভাবিক যান চলাচলও ব্যাহত হয়।
চলছে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার অভিযান
সহিংসতার পর ঘটনাস্থলের বিভিন্ন ভিডিও ও ছবি সংগ্রহ করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের কাজ শুরু করে পুলিশ। মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মাদ নাছের রিকাবদার জানিয়েছেন, আটকদের যাচাই-বাছাই করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
পুলিশের ভাষ্য, মামলায় বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হলেও তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনায় কারা জড়িত ছিলেন, তা যাচাই করা হবে। সে অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে ডিএনসিসি জানিয়েছে, রাজধানীর ফুটপাত দখলমুক্ত করার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। ফলে মিরপুর-১০ এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান ও এর পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একদিকে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুরের ঘটনায় দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে। অন্যদিকে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে উচ্ছেদ কার্যক্রমের সময় যাতে নতুন করে সংঘর্ষ বা জনদুর্ভোগ তৈরি না হয়, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে হবে।









