,

রাজধানীতে আট মাসে পরিচয়হীন ৪০০ মরদেহের দাফন

রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে অজ্ঞাত অবস্থায় মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নিয়মিতই সামনে আসছে। কখনো খাল-ঝিল, কখনো ফুটপাত বা হাসপাতালের আশপাশে, আবার কখনো পরিত্যক্ত ভবন কিংবা নির্জন কোনো স্থানে পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে মরদেহ। কিছু মরদেহে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে, আবার দীর্ঘ সময় পড়ে থাকার কারণে পচন ধরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে পরিচয় শনাক্তের গুরুত্বপূর্ণ আলামত।

আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে রাজধানীতে ৪০০টি বেওয়ারিশ মরদেহের দাফন বা সৎকার করা হয়েছে। তবে এই সংখ্যা রাজধানীতে উদ্ধার হওয়া মোট অজ্ঞাত মরদেহের সংখ্যা নয়। কারণ, উদ্ধারের সময় পরিচয় জানা না থাকলেই কোনো মরদেহকে অজ্ঞাত হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। পরে পরিচয় শনাক্ত ও স্বজনদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলে। সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে কোনো মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।

সম্প্রতি জুরাইনে এক কিশোরের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা বিষয়টিকে আবারও সামনে এনেছে। গত শুক্রবার রাজধানীর শ্যামপুর থানার জুরাইন রেলওয়ে সেতুর নিচে একটি পরিত্যক্ত পাবলিক টয়লেট থেকে আনুমানিক ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মাথার অংশে পচন ধরে হাড় বেরিয়ে এসেছিল। কপালেও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়।

পুলিশের ধারণা, মরদেহ উদ্ধারের ১৫ থেকে ২০ দিন আগে কিশোরটির মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

শ্যামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম জানান, মরদেহে অতিরিক্ত পচন ধরায় সিআইডি ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করতে পারেনি। পরিচয় শনাক্তের জন্য স্থানীয় এলাকায় প্রচারণাও চালানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কিশোরটির বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

অজ্ঞাত ও বেওয়ারিশ মরদেহ এক নয়

জুরাইনের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। চলতি বছর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনগুলোর হিসাবে, শুধু শাহবাগ থানা এলাকাতেই চলতি বছরে অন্তত ১১টি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা সামনে এসেছে।

তবে অজ্ঞাত মরদেহ এবং বেওয়ারিশ মরদেহকে একই হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কোনো মরদেহ উদ্ধারের সময় তার পরিচয় জানা না থাকলে সেটি অজ্ঞাত হিসেবে নথিভুক্ত হয়। এরপর পুলিশ পরিচয় শনাক্ত এবং স্বজনদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হলে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। আর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিচয় শনাক্ত করা না গেলে সেটি বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন বা সৎকারের ব্যবস্থা করা হয়।

এ কারণে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের ৪০০টি বেওয়ারিশ মরদেহের হিসাবকে রাজধানীতে উদ্ধার হওয়া মোট অজ্ঞাত মরদেহের সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।

আট মাসে দাফন ৪০০ মরদেহ

আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের হিসাবে, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৪০০টি বেওয়ারিশ মরদেহের শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মধ্যে রায়েরবাজার কবরস্থানে ৩২৬টি এবং জুরাইন কবরস্থানে ৭৪টি মরদেহ দাফন করা হয়।

মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ৩০টি, ফেব্রুয়ারিতে ৫৯টি, মার্চে ৫২টি, এপ্রিলে ৪৬টি, মে মাসে ৫৬টি, জুনে ৬৭টি, জুলাইয়ে ৪২টি এবং আগস্টে ৪৮টি মরদেহের দাফন বা সৎকার করা হয়েছে।

অর্থাৎ আট মাসে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৫০টি বেওয়ারিশ মরদেহের শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করেছে সংস্থাটি। তবে এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে রাজধানীতে অজ্ঞাত মরদেহের সংখ্যা বেড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

পুলিশও বিষয়টিকে সরাসরি বৃদ্ধির প্রবণতা হিসেবে দেখছে না। ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, এতসংখ্যক বেওয়ারিশ মরদেহের বিষয়ে তার কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। ডিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. আক্তার হোসেনও জানিয়েছেন, বেওয়ারিশ মরদেহ বেড়েছে—এমন তথ্য পুলিশের কাছে নেই। বিষয়টি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

অন্যদিকে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুলিশের অনুমোদন ছাড়া কোনো মরদেহকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয় না।

সময় বাড়লে কঠিন হয় পরিচয় শনাক্ত

অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয় শনাক্তের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মরদেহ নতুন অবস্থায় উদ্ধার করা গেলে আঙুলের ছাপ, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, মোবাইল ফোন, পোশাক এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত সামগ্রী থেকে পরিচয় শনাক্তের সুযোগ থাকে। এসব আলামত তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে কাজ করতে পারে।

কিন্তু কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ মরদেহ পড়ে থাকলে পচন শুরু হয়। এতে আঙুলের ছাপ নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং শরীরের দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্যও পরিবর্তিত হয়ে যায়। তখন তদন্তকারীদের ডিএনএ পরীক্ষা, সিসিটিভি ফুটেজ, নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য এবং স্বজনদের দেওয়া শারীরিক বর্ণনার ওপর নির্ভর করতে হয়।

সব ঘটনায় এসব সূত্র পাওয়া যায় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মরদেহের সঙ্গে মোবাইল ফোন বা পরিচয় বহনকারী নথি থাকে না। আবার সিসিটিভি ক্যামেরার আওতার বাইরে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও ঘটতে পারে। ফলে পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়।

জুরাইনের কিশোরটির ক্ষেত্রেও পচনের কারণে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। এখন তার পরিচয় শনাক্তে অন্যান্য তথ্য ও তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

সামাজিক বাস্তবতার দিকও দেখার তাগিদ

সমাজবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, পরিচয়হীন মরদেহের বিষয়টি শুধু আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা সম্ভব নয়।

তার মতে, নগরজীবনে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়া, গৃহহীনতা, একাকিত্ব এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার মতো বিষয়গুলোর সঙ্গেও পরিচয়হীন মরদেহের ঘটনা সম্পর্কিত হতে পারে। তবে কোনো মরদেহের পেছনে অপরাধ বা হত্যাকাণ্ড রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন।

পরিচয় শনাক্তের সক্ষমতা বাড়াতে পুলিশের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্যভান্ডার কার্যকর রাখা, হাসপাতাল, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানো এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় জোরদারের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

রাজধানীতে আট মাসে ৪০০ বেওয়ারিশ মরদেহের দাফনের তথ্য তাই একটি মানবিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার দিক সামনে আনে। তবে এই সংখ্যা দিয়ে রাজধানীতে উদ্ধার হওয়া সব অজ্ঞাত মরদেহের চিত্র পাওয়া যায় না। পূর্ণাঙ্গ সরকারি তথ্যভান্ডার ও সমন্বিত হিসাব থাকলেই কেবল এ ধরনের ঘটনার প্রকৃত পরিসর এবং সময়ের সঙ্গে এর পরিবর্তনের ধরণ আরও স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব হবে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।