,

স্মরণ: নৃত্যশিল্পের কিংবদন্তি গওহর জামিল

বাংলাদেশের নৃত্যশিল্পের বিকাশ ও আধুনিক নৃত্যচর্চার ইতিহাসে গওহর জামিল একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। সৃজনশীলতা, অধ্যবসায় এবং শিল্পের প্রতি গভীর নিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি নৃত্যকে শুধু মঞ্চের পরিবেশনা হিসেবে দেখেননি; বরং বাংলার মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও মানবিক অনুভূতি প্রকাশের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি নতুন প্রজন্মের শিল্পী তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

১৯২৫ সালে বিক্রমপুর পরগনার সিরাজদিখান গ্রামের নাথ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন গওহর জামিল। তাঁর পারিবারিক নাম ছিল গণেশচন্দ্র নাথ। ছোটবেলা থেকেই নৃত্যের প্রতি তাঁর আকর্ষণ তৈরি হয়। মাত্র আট বছর বয়সে প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী কেলু নায়ারের ‘শিকারী নৃত্য’ দেখে তাঁর মনে নৃত্যশিল্পী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। পরবর্তী জীবনে সেই আকাঙ্ক্ষাই রূপ নেয় দীর্ঘ সাধনা ও শিল্পচর্চায়।

নিজেকে একজন পরিপূর্ণ নৃত্যশিল্পী হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি দেশের ও উপমহাদেশের একাধিক বিশিষ্ট শিল্পী ও শিক্ষকের কাছে প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৩৫ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর দেব, পণ্ডিত রবিশংকর, উদয় শংকর ও বুলবুল চৌধুরীর কাছ থেকে নৃত্যশিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে ১৯৬২ সালে ভারতে মারুথাপ্পা পিল্লাই ও রামনারায়ণ মিশ্রের কাছে ভরতনাট্যম ও কত্থক নৃত্যে প্রশিক্ষণ নেন। শাস্ত্রীয় নৃত্যের পাশাপাশি দেশীয় লোকজ ধারার সঙ্গে তাঁর পরিচয় তাঁর শিল্পভাবনাকে আরও বিস্তৃত করে।

নৃত্যকে ব্যক্তিগত সাধনার মধ্যে আটকে না রেখে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগও ছিল তাঁর। ১৯৫০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সাংস্কৃতিক সংস্থা ‘কলা ভবন’। এরপর ১৯৫৯ সালে গড়ে তোলেন ‘জাগো আর্ট সেন্টার’। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নৃত্যশিক্ষা ও শিল্পচর্চার সুযোগ তৈরি হয় এবং বহু নতুন শিল্পী নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পান। একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর প্রভাব তাই তাঁর নিজের পরিবেশনার গণ্ডি ছাড়িয়ে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।

গওহর জামিল ছিলেন দক্ষ কোরিওগ্রাফার ও নৃত্যনাট্যকার। নৃত্যের সঙ্গে কাহিনি, ইতিহাস, সামাজিক বাস্তবতা ও মানুষের আবেগকে যুক্ত করে তিনি বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি করেন। তাঁর নৃত্যনাট্যের মধ্যে ‘সামান্য ক্ষতি’, ‘আনারকলি’, ‘বিচার’, ‘কাঞ্চনমালা’, ‘ইতিহাসের একটি পাতা’ এবং ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব কাজে নৃত্যকে তিনি কেবল শারীরিক ভঙ্গিমার শিল্প হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং গল্প ও বক্তব্য প্রকাশের একটি স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন।

বাংলার লোকজ জীবন ছিল তাঁর সৃষ্টিশীলতার অন্যতম প্রধান উৎস। বাংলার প্রকৃতি, গ্রামীণ সমাজ, শ্রমজীবী মানুষের জীবন এবং সাধারণ মানুষের আনন্দ-বেদনা তাঁর নৃত্যসৃষ্টিতে বিশেষভাবে উঠে এসেছে। ‘জেলে নৃত্য’ বা ‘পলো’, ‘সাঁওতাল’, ‘গারো’, ‘মোরং’, ‘গ্রাম্য মেলা’, ‘জিপসি’, ‘ধোপা’, ‘সুখী জোড়া’, ‘চা বাগান’ ও ‘মাতৃস্নেহ’ তাঁর উল্লেখযোগ্য খণ্ডনৃত্যের মধ্যে রয়েছে। এসব পরিবেশনায় স্থানীয় জীবন ও সংস্কৃতির নানা রূপ নৃত্যের মাধ্যমে দর্শকের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা ছিল স্পষ্ট।

দেশের সীমানার বাইরেও গওহর জামিলের শিল্পীজীবনের বিস্তার ঘটে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক উৎসবে অংশ নিয়ে তিনি রাশিয়া, চীন, হংকং, মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে নৃত্য পরিবেশন করেন। এসব সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের নৃত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে উপস্থাপনের সুযোগ পান তিনি। যুক্তরাষ্ট্র সফরেও বিভিন্ন সংগীত ও নৃত্যপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের শিল্পচর্চার সঙ্গে পরিচিত হন।

নৃত্যের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। তিনি চলচ্চিত্রে নৃত্য পরিচালনার কাজ করেছেন এবং অভিনয়ও করেছেন। ‘মনের মতো বউ’, ‘পাগলা রাজা’ ও ‘বেলা শেষের গান’ তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ফলে মঞ্চের নৃত্যচর্চার পাশাপাশি চলচ্চিত্রের মাধ্যমেও তাঁর শিল্পীসত্তার প্রকাশ ঘটেছে।

ব্যক্তিজীবনেও তিনি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫২ সালে ধর্মান্তরিত হওয়ার পর তিনি প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী ও চলচ্চিত্র অভিনেত্রী রওশন জামিলকে বিয়ে করেন। শিল্পচর্চায় সক্রিয় এই দম্পতি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁদের একমাত্র কন্যা কান্তা জামিল।

১৯৮০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর এক সড়ক দুর্ঘটনায় গওহর জামিলের জীবনাবসান ঘটে। মাত্র ৫৫ বছর বয়সে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু বাংলাদেশের নৃত্যাঙ্গনে গভীর শূন্যতা তৈরি করে। তবে তাঁর শিল্পকর্ম ও শিক্ষাদানের মাধ্যমে যে উত্তরাধিকার তৈরি হয়েছিল, তা তাঁর মৃত্যুর পরও টিকে থাকে।

শিল্পকলায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৮১ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে। পরে ২০০১ সালে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ তাঁর নামে ডাকটিকিট প্রকাশ করে। রাষ্ট্রীয় এই স্বীকৃতিগুলো বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতিতে তাঁর অবদানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিরও বহিঃপ্রকাশ।

গওহর জামিলের মৃত্যুর কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও তাঁর সৃষ্ট নৃত্য, নৃত্যনাট্য ও শিল্পশিক্ষার ধারা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। তিনি নৃত্যের মাধ্যমে বাংলার মানুষের জীবন ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরেছিলেন এবং শিল্পকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে নিতে কাজ করেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিল্পী এবং সৃষ্টিশীল কাজগুলো তাঁর অবদানের ধারাবাহিকতার সাক্ষ্য বহন করে।

১৯৮০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তাঁর প্রয়াণের দিনটি তাই শুধু একজন শিল্পীর মৃত্যুর স্মৃতি নয়; বাংলাদেশের নৃত্যচর্চার ইতিহাসে এক নিবেদিত সাধকের অবদান স্মরণ করার দিনও। গওহর জামিল তাঁর শিল্পসাধনার মধ্য দিয়ে যে পথ তৈরি করে গেছেন, তা দেশের নৃত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।