কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় অপহরণের পর সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগ ওঠা তমা খাতুন (২০) চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা গেছেন। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাত আড়াইটার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় একজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। অন্যদের শনাক্ত ও আটকের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
নিহত তমা খাতুন ভেড়ামারা উপজেলার গোলাপনগর এলাকার তোফাজ্জল হোসেনের মেয়ে। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রাতে গোলাপনগর এলাকা থেকে তাঁকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে অজ্ঞাত একটি স্থানে নিয়ে কয়েকজন মিলে তাঁকে ধর্ষণ ও নির্যাতন করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে বাড়ির কাছের একটি নির্জন স্থানে ফেলে রেখে যাওয়া হয় বলে পরিবারের দাবি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে গোলাপনগর বাজারের একটি পার্লার থেকে নিজ বাড়ি ফকিরাবাদ বখশীপাড়ার দিকে ফিরছিলেন তমা। ওই সময় মোটরসাইকেলে থাকা কয়েকজন তাঁর পথরোধ করেন। পরে তাঁকে জোর করে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর তমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। স্থানীয়দের ধারণা, ৪ থেকে ৫ জনের একটি দল তাঁকে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে নির্যাতন করে। রাত ১২টার দিকে বখশীপাড়ার কাছাকাছি একটি নির্জন মোড়ে তাঁকে মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলে রেখে অভিযুক্তরা চলে যায় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
খবর পেয়ে রাত সাড়ে ১২টার পর পরিবারের সদস্যরা তমাকে উদ্ধার করেন। রাত ১টার দিকে তাঁকে ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা দ্রুত তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। পরে সেখানে চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর শুক্রবার গভীর রাতে তাঁর মৃত্যু হয়।
ঘটনার পরদিন তমার মা কাজলী খাতুন ভেড়ামারা থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। পুলিশ বলছে, অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দেড় বছর আগে গোলাপনগর এলাকার আবু বক্করের সঙ্গে তমার বিয়ে হয়েছিল। প্রায় দেড় মাস আগে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। তমাকে অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনায় সাবেক স্বামী আবু বক্করের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তাধীন।
ভেড়ামারা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রকিবুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তমার সাবেক স্বামী আবু বক্করকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তমার মামাতো ভাই হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, ১৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার পর গোলাপনগর বাজার থেকে তমাকে অপহরণ করা হয়। তাঁর ভাষ্য, নির্যাতনের পর তাঁকে বাড়ির পাশের একটি নির্জন স্থানে ফেলে যাওয়া হয়েছিল। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চার দিন পর তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলেও তিনি জানান।
তবে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো পুলিশের তদন্তে স্পষ্ট হয়নি। তমাকে কারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল, তাঁকে কোথায় রাখা হয়েছিল, নির্যাতনের সঙ্গে কতজন জড়িত ছিল এবং ঘটনায় সাবেক স্বামীর ভূমিকা কী—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে বের করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে সংগৃহীত তথ্য, সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা হবে।
একজন তরুণীর এমন মৃত্যুতে পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে শোক নেমে এসেছে। স্বজনেরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। পুলিশও বলছে, অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় তদন্ত চালানো হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।








