,

রবীন্দ্রসংগীতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র: কিংবদন্তি সুচিত্রা মিত্রের জীবন ও শিল্পযাত্রা

“আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি…”
মুক্তিকামী বাঙালির হৃদয়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন, স্বদেশপ্রেম আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে সুচিত্রা মিত্রের দৃপ্ত কণ্ঠ হয়ে উঠেছিল এক গভীর প্রেরণার উৎস। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে রবীন্দ্রনাথের এই গানটি তাঁর কণ্ঠে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গে এক আত্মিক বন্ধনে যুক্ত হয়েছিল। সুচিত্রা মিত্র কেবল একজন প্রথিতযশা রবীন্দ্রসংগীতশিল্পীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একাধারে সংগীতশিক্ষক, গবেষক ও অভিনেত্রী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের ভাব, বাণী ও সুরকে হৃদয়ে ধারণ করে তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব এক অনন্য সংগীতভুবন।
১৯২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বিহারের গুঝান্ডি অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন এই শিল্পী। তাঁর পিতা ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবার ও সাহিত্য-সংস্কৃতির আবহের সঙ্গে তাঁদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। শৈশব থেকেই রবীন্দ্রসংগীতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ জন্ম নেয় এবং পঙ্কজ মল্লিকের কাছে তাঁর সংগীতশিক্ষার প্রাথমিক পাঠ শুরু হয়। পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনের সংগীতভবনে বৃত্তি নিয়ে সংগীতশিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। সেখানে ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, শান্তিদেব ঘোষ ও শৈলজারঞ্জন মজুমদারের মতো প্রথিতযশা শিক্ষকদের সান্নিধ্যে তাঁর সংগীতসাধনা পূর্ণতা লাভ করে।
রবীন্দ্রসংগীতের মূল বাণী, স্বরলিপি ও সুরের বিশুদ্ধতা রক্ষায় সুচিত্রা মিত্র ছিলেন সম্পূর্ণ আপসহীন। তাঁর কণ্ঠে প্রেমের গান পেয়েছে কোমল আবেগ, প্রকৃতির গান পেয়েছে নিবিড় সৌন্দর্য, আর স্বদেশ ও মানবতার গান পেয়েছে এক দৃপ্ত উচ্চারণ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর শিল্পীসত্তার এক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দিক প্রকাশিত হয়। দুই বাংলার মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি ও মুক্তিকামী হৃদয়ের এক শক্তিশালী সেতুবন্ধন হয়ে উঠেছিল তাঁর কণ্ঠে গাওয়া গানগুলো।
শিল্পের সঙ্গে মানুষের মুক্তির সম্পর্ক বিশ্বাস করতেন বলেই তিনি দীর্ঘকাল ভারতীয় গণনাট্য সংঘের (IPTA) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। চলচ্চিত্রে নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি তিনি অভিনয়েও মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। উমাপ্রসাদ মৈত্র নির্মিত ‘জয়বাংলা’ এবং মৃণাল সেনের ‘পদাতিক’ চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। দীর্ঘকাল রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্রসংগীত বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি সংগীতশিক্ষা ও গবেষণায় অনন্য অবদান রাখেন।
সঙ্গীতে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৪ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করে। এ ছাড়া ১৯৮৬ সালে তিনি ‘সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার’ এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মর্যাদাপূর্ণ ‘দেশিকোত্তম’ সম্মাননা লাভ করেন। ২০০১ সালে তিনি কলকাতার শেরিফ মনোনীত হন। দীর্ঘ ৮৬ বছরের বর্ণাঢ্য জীবন পার করে ২০১১ সালের ৩ জানুয়ারি কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি।
সুচিত্রা মিত্রের গাওয়া গান, সংগীতশিক্ষা এবং আদর্শ আজও নতুন প্রজন্মকে রবীন্দ্রসংগীতের গভীরতা ও অন্তর্নিহিত দর্শন উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। সত্যিকারের শিল্পীর মৃত্যু হয় না, বরং তাঁর সৃষ্টির আলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে।
Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।