,

চাঁদা না দিলে হামলা-গুলি-হত্যা, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া কিছু নৃশংস ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে গভীর শঙ্কা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। চাঁদার দাবি প্রতাহ্যাখ্যান করলেই জীবন হারানোর ঝুঁকি, প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি কিংবা চাপাতির কোপের শিকার হওয়া—এসব ঘটনা আমাদের আইনশৃঙ্খলার বর্তমান চিত্র নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলেছে। শুধু ফুটপাতে ব্যবসা করা কিংবা কর্মস্থলে বসা নয়, সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও আজ নিরাপদ নয় বলে অভিযোগ উঠছে। অপরাধী শনাক্তকরণ এবং তাদের কঠোর শাস্তির দাবি এখন সর্বস্তরের মানুষের মুখে মুখে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযান চালিয়ে অপরাধের বিস্তার সাময়িকভাবে থামানো সম্ভব, কিন্তু স্থায়ী সমাধান মেলে না। এর জন্য প্রয়োজন বিচারব্যবস্থার আমূল সংস্কার। মামলার তদন্ত থেকে শুরু করে আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন, বিচারকাজ সম্পন্ন হওয়ার দীর্ঘসূত্রিতা এবং অপরাধীদের বারবার জামিনে বেরিয়ে এসে ফের অপরাধে জড়ানোর প্রবণতা জোরালোভাবে নজরদারিতে আনতে হবে। রাজনৈতিক ছত্রছায়া কিংবা পুনর্বাসনের সুযোগ বন্ধ না করলে এই চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট কখনো ভাঙা সম্ভব নয়।
গত মঙ্গলবার কেরানীগঞ্জের আরশীনগর এলাকায় রাজ সেলুনে ফরহাদ হোসেন নামের এক মাছ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, ফুটপাতে দোকান বসানোকে কেন্দ্র করে চাঁদা না দেওয়ায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা তার ওপর চড়াও হয়। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, নিহত ফরহাদ নিজেও একটি কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পূর্ব শত্রুতার জেরে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এর রেশ কাটতে না কাটতে গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর বাড্ডার হোসেন মার্কেটের পেছনে ময়নারবাগ বউবাজার এলাকায় নিজ বাসায় ঢুকে মো. রানা নামের এক যুবককে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। ওই হামলার পেছনেও চাঁদার দাবির যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, চট্টগ্রামের চিকিৎসক এম ওয়াই এফ পারভেজের অভিজ্ঞতা আরও ভয়ংকর। বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে ‘বড় সাজ্জাদ’ ও তার সহযোগী পরিচয়ে তার কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে চেম্বারে এসে গুলি করে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয় তাকে। এ ঘটনায় হাটহাজারী থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন ওই চিকিৎসক।
চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করতে গিয়ে উল্টো বিপাকে পড়ার ঘটনাও কম নয়। গত ১০ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদপুরের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. মান্নান হোসেন শাহীন অভিযোগ করেন, এলাকায় পাহারার উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকে তিনি বারবার হামলার শিকার হচ্ছেন। এমনকি সম্প্রতি সুয়ারেজ লাইনের কাজের সময় চাঁদা দিতে বাধা দেওয়ায় তার ওপর ফের হামলা হয়। অথচ উল্টো তাকেই চাঁদাবাজ হিসেবে প্রোপাগাণ্ডা ছড়ানো হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
অপরাধ দমনের কৌশল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম জানান, শুধু পুলিশি অভিযান বা গ্রেপ্তারের ওপর নির্ভর করে অপরাধ দমন করা অসম্ভব। পুলিশ, আদালত ও কারাগার—এই তিনটি স্তম্ভকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। মামলার তদন্তে ঘাটতি বা প্রসিকিউশনের দুর্বলতাগুলো নিয়মিত পর্যালোচনা করা জরুরি। একই সুর শোনা গেছে পুলিশের অপরাধ ও অপারেশন বিভাগের অতিরিক্ত আইজিপি খোন্দকার রফিকুল ইসলামের গলাতেও। তিনি মনে করেন, পুলিশ অপরাধীদের ধরে আইনের হাতে সঁপে দিলেও আইনি মারপ্যাঁচ এবং দীর্ঘসূত্রিতার কারণে তারা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে লিপ্ত হয়। বিচারপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিশ্চিত না করলে শুধু পুলিশের ওপর চাপ বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম সোহাগ সমাজের অন্তমূলের সমস্যাগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। তার মতে, নগরে বেড়ে ওঠা কাজহীন, ভাসমান ও ঝুঁকিপূর্ণ কিশোর-যুবকদের অপরাধ চক্রগুলো সহজেই ব্যবহার করছে। পারিবারিক অস্থিরতা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে অনেকেই ছোট অপরাধ থেকে শুরু করে পরে বড় ধরনের সহিংস অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাই কেবল গ্রেপ্তার নয়, অপরাধে প্রবেশের পথগুলো বন্ধ করতে কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে, সাধারণ মানুষ এখন একটি নিরাপদ ও ভীতিহীন জীবন চায়, যেখানে নিজের ব্যবসা বা কর্মস্থলে স্বস্তিতে টিকে থাকা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরই প্রাথমিক দায়িত্ব।
Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।