১৮ সেপ্টেম্বর শহীদ লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনের জন্মদিন। দেশপ্রেম, সাহস ও আত্মত্যাগের জন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন। পাকিস্তান নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেও বাঙালির অধিকার, আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন তিনি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম অভিযুক্ত হিসেবে তাঁর নাম ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে তাঁর শাহাদাত সেই ইতিহাসকে আরও বেদনাবিধুর করে তুলেছে।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন ১৯৩৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পিরোজপুর জেলার ডুমুরিতলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মোফাজ্জেল আলী ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা এবং মা লতিফুন্নেছা বেগম।
শৈশব থেকেই দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদাবোধ তাঁর ব্যক্তিত্বের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল। ১৯৪৭ সালে বাগেরহাটের কচুয়া হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর তিনি বাগেরহাট কলেজে ভর্তি হন। পরে বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে আইএসসি পড়ার সময় ১৯৫০ সালে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে যোগ দেন।
একই বছর তিনি ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনীতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে মেকানিক্যাল ও মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেন। পেশাগত দক্ষতার কারণে নৌবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি লেফটেন্যান্ট কমান্ডার পদে উন্নীত হন।
আগরতলা মামলা ও গ্রেপ্তার
পাকিস্তানি শাসনামলে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য ও রাজনৈতিক অধিকারহীনতা নিয়ে তাঁর অবস্থান ক্রমে দৃঢ় হয়। সামরিক বাহিনীতে কর্মরত বাঙালি সদস্যদের সংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগও ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
১৯৬৭ সালের ৯ ডিসেম্বর সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের একটি দল পাকিস্তান দেশরক্ষা আইনে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পরের বছর পাকিস্তান সরকার ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য’ নামে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলা শুরু করে। ইতিহাসে এটি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে পরিচিত।
মামলার ৩৫ জন অভিযুক্তের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন প্রথম আসামি এবং লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন দ্বিতীয় আসামি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার লক্ষ্যে নৌবাহিনীর বাঙালি সদস্যদের সংগঠিত করা এবং সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে আন্দোলনের পরিকল্পনা করা।
আগরতলা মামলা দ্রুত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় পরিণত হয়। মামলার প্রতিবাদে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয় এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান তীব্র রূপ নেয়। প্রবল গণআন্দোলনের মুখে ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার মামলা প্রত্যাহার করে। শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব অভিযুক্ত মুক্তি পান।
মুক্তির পর মোয়াজ্জেম হোসেন আবার নৌবাহিনীতে যোগ দেন। তবে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও বাঙালির স্বাধীনতার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান বদলায়নি।
স্বাধীনতার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা
১৯৭০ সালের ১৮ মার্চ তিনি পাকিস্তান নৌবাহিনী থেকে অবসর নেন। অবসরের পর তিনি সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। ২৪ মার্চ স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলনের ঘোষণা দেন এবং ২৮ মার্চ ‘লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়ন কমিটি’ গঠন করেন। পরবর্তী সময়ে এই সংগঠনকে রাজনৈতিক দলে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের সময়ও তিনি সক্রিয় ছিলেন। স্বাধীনতার প্রশ্নে জনমত গড়ে তোলা এবং রাজনৈতিক কর্মীদের সংগঠিত করার পাশাপাশি তাঁদের সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের নির্দেশ দেন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংগঠন ও জনমত তৈরির কাজেও তিনি উদ্যোগী হন।
তখন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। বাঙালির স্বাধীনতার দাবি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, আর পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের সঙ্গে সংঘাতও বাড়ছিল। এই পরিস্থিতিতে মোয়াজ্জেম হোসেন স্বাধীনতার আন্দোলনকে সামনে রেখে নিজের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান।
২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞ ও শাহাদাত
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক সামরিক অভিযান ও হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণ চালানো হয়। স্বাধীনতার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও হয়ে ওঠেন লক্ষ্যবস্তু।
২৬ মার্চ সকালে কর্নেল তাজের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল ঢাকায় মোয়াজ্জেম হোসেনের বাসভবনে প্রবেশ করে। সেখানে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
স্বাধীনতার সংগ্রামের একেবারে সূচনালগ্নে তাঁর এই মৃত্যু বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মর্মান্তিক অধ্যায় হয়ে আছে। যিনি একসময় পাকিস্তান নৌবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতেই প্রাণ হারান। তাঁর জীবন ও মৃত্যু বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
স্মৃতি সংরক্ষণে নানা উদ্যোগ
স্বাধীনতার পর শহীদ মোয়াজ্জেম হোসেনের স্মৃতি সংরক্ষণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭৬ সালের ১৬ জানুয়ারি রাঙামাটিতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণ ঘাঁটির নামকরণ করা হয় ‘বিএনএস শহীদ মোয়াজ্জেম’।
১৯৯৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর তাঁর নামে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়। ঢাকায় তাঁর নামে একটি সড়কের নামকরণও করা হয়েছে। ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে।
ব্যক্তিজীবনে তিনি চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত খল অভিনেতা রাজের বড় ভাই ছিলেন। তবে তাঁর ঐতিহাসিক পরিচয় পারিবারিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন দক্ষ নৌ কর্মকর্তা, আগরতলা মামলার অন্যতম অভিযুক্ত, স্বাধীনতাকামী সংগঠক এবং মুক্তিযুদ্ধের শহীদ হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর স্বতন্ত্র অবস্থান রয়েছে।
ইতিহাসে অম্লান স্মৃতি
শহীদ লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনের জীবন ছিল পেশাগত দায়িত্ব, রাজনৈতিক বিশ্বাস ও দেশপ্রেমের এক অনন্য সমন্বয়। পাকিস্তান নৌবাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে তিনি শেষ পর্যন্ত বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। আগরতলা মামলায় গ্রেপ্তার, মুক্তির পর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং ১৯৭১ সালে শাহাদাত—তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
১৮ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিনে তাই তাঁকে স্মরণ করা হয় গভীর শ্রদ্ধায়। তাঁর জীবন বাঙালির অধিকার ও আত্মমর্যাদার সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গকারী এই নৌসেনার স্মৃতি বাংলাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘদিন অম্লান হয়ে থাকবে।









