,

এনসিএলে শিরোপার স্বপ্ন, তরুণদের ঘিরে নতুন প্রত্যাশা

জাতীয় ক্রিকেট লিগের (এনসিএল) নতুন মৌসুম সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন বিভাগের ক্রিকেটারদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আলাদা আলাদা লক্ষ্য ও প্রত্যাশা। কারও চোখ শিরোপায়, কেউ চাইছেন হারানো শক্তি ফিরে পেতে। আবার কারও কাছে এই প্রতিযোগিতা নিজেকে প্রমাণ করার পাশাপাশি জাতীয় দলের জন্য ভবিষ্যৎ ক্রিকেটার তৈরির গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। ঘরোয়া ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক বৃদ্ধিও এবারের মৌসুমে খেলোয়াড়দের দায়িত্ববোধ বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন কয়েকজন ক্রিকেটার।

সিলেটের জাকির হাসানের কাছে এনসিএলের শিরোপা খেলোয়াড়দের জন্য বিশেষ সম্মানের। তাঁর মতে, ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘরোয়া ক্রিকেটে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে বাড়তি সুবিধার সঙ্গে দায়িত্বও বেড়েছে। বোর্ড যখন খেলোয়াড়দের আগের তুলনায় ভালো পারিশ্রমিক দিচ্ছে, তখন মাঠে নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়েও তার প্রতিদান দিতে হবে। গতবারের সাফল্য ধরে রেখে এবারও ভালো ক্রিকেট খেলে শিরোপা জেতাই সিলেটের লক্ষ্য।

খুলনার মোহাম্মদ মিঠুনের নজর দলের পেস আক্রমণ ও নতুন প্রতিভার দিকে। তাঁর দলে বেশ কয়েকজন দ্রুতগতির বোলার রয়েছেন, যাদের অনেকেই জাতীয় দলের আশপাশে আছেন। বাঁহাতি পেসার রাহিনকে তিনি সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছেন। ব্যাটিংয়ে দিশানও গত মৌসুমে ভালো পারফর্ম করেছেন। মিঠুনের মতে, নিয়মিত কঠিন মানের বোলিংয়ের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ ব্যাটারদের মানসিক দৃঢ়তা বাড়ায়। বিশেষ করে দ্রুতগতির বোলারদের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা তরুণদের কঠিন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা বাড়াতে পারে। তাঁর দৃষ্টিতে, এনসিএলে এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা যত বাড়বে, জাতীয় দলের জন্য খেলোয়াড় তৈরির সুযোগও তত বিস্তৃত হবে।

ময়মনসিংহের রাকিবুল হাসানের ভাবনায় রয়েছে দলের বোলিং শক্তি পুনর্গঠন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কয়েকজন বোলার একসঙ্গে উঠে যাওয়ায় দলটির বোলিং বিভাগে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। এখন সেই জায়গা আবার শক্ত করার চেষ্টা চলছে। রাজ ভাই, আল আমিন, শিপলু ও ডলার মাহমুদের মতো বোলারদের উঠে আসার কথা উল্লেখ করে রাকিবুল জানান, বোলিং ঐতিহ্যকে সামনে রেখে নতুন ক্রিকেটার তৈরি করাই তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য। সিনিয়রদের অভিজ্ঞতা আর তরুণদের উদ্যম একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারলে দল ধীরে ধীরে আগের অবস্থানে ফিরতে পারবে বলে তাঁর বিশ্বাস।

ময়মনসিংহে প্রস্তুতিতেও দেওয়া হচ্ছে বাড়তি গুরুত্ব। ফিল্ডিং, দৌড় এবং শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে নিয়মিত কাজ করছেন ক্রিকেটাররা। দলের সদস্যদের মনোযোগও সন্তোষজনক বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গত মৌসুমে ভালো ক্রিকেট খেলার পর এবার আরও উন্নতি করতে চায় ময়মনসিংহ। বিশেষ করে তরুণ ক্রিকেটারদের উৎসাহ দেওয়া এবং তাদের প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। একসময় ময়মনসিংহের ক্রিকেটের যে পরিচিতি ছিল, দল না থাকায় সেটি বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। গত মৌসুম থেকে আবার সেই পথচলা শুরু হয়েছে। মাঠের পারফরম্যান্সের মধ্য দিয়েই পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

বরিশালের সামনে রয়েছে নিজেদের অবস্থান বদলের চ্যালেঞ্জ। গত কয়েকটি মৌসুমে প্রত্যাশিত ফল না এলেও গতবারের শেষ ম্যাচটি তাদের সম্ভাবনার একটি উদাহরণ হয়ে আছে। ইফতেখার হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, শেষ ম্যাচটি জিততে পারলে বরিশালের চ্যাম্পিয়ন বা রানার্সআপ হওয়ার সুযোগ ছিল। এবার দায়িত্ব পাওয়ার পর দলকে আরও ভালো জায়গায় নেওয়ার লক্ষ্য তাঁর। সিনিয়র ক্রিকেটারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে দলের সমন্বয় বাড়াতে চান তিনি।

বরিশালের দল গঠনে এবার আরেকটি পরিবর্তনও চোখে পড়ছে। বাইরের খেলোয়াড়ের সংখ্যা আগের তুলনায় কম হলেও কয়েকজন ভালো ব্যাটসম্যান দলে এসেছেন। ফলে যাঁরা আছেন, তাঁদের নিয়েই কার্যকর দল তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। ক্রিকেটে ব্যক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি দলীয় সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ—এই জায়গাতেই জোর দিতে চান ইফতেখার। খেলোয়াড়েরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী একসঙ্গে পারফর্ম করতে পারলে বরিশাল ভালো ফল করতে পারে বলে তিনি মনে করছেন।

ঢাকার মাহিদুল ইসলামের কাছে এনসিএলের মৌসুমটি ব্যক্তিগত উন্নতি ও দলীয় ধারাবাহিকতার পরীক্ষা। তাঁর মতে, কোনো খেলোয়াড় কখন কোথায় সুযোগ পাবেন বা একটি দলে কতদিন থাকবেন, সেটি সবসময় তাঁর হাতে থাকে না। নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিষয়টি হলো পারফরম্যান্সের মান ধরে রাখা এবং প্রতিনিয়ত উন্নতির চেষ্টা করা।

ঢাকার ক্রিকেটের দীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে দলটিতে পরিবর্তন এসেছে। গত দুই-তিন বছরে বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার অবসর নিয়েছেন। তাঁদের জায়গায় তরুণরা উঠে আসছেন এবং নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন। মাহিদুলের মতে, ঢাকা ভালো ক্রিকেট খেললেও সব ম্যাচ বা পুরো মৌসুমে সেই পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি। এবার সেই ঘাটতি কাটিয়ে পুরো মৌসুমে স্থিরভাবে পারফর্ম করাই লক্ষ্য।

চট্টগ্রামের ইয়াসির আলীর লক্ষ্য অবশ্য আরও সরাসরি—শিরোপা। তাঁর মতে, পুরো দলকে একসঙ্গে পাওয়া গেলে চট্টগ্রাম দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে শক্তিশালী দলগুলোর একটি হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে জাতীয় দল, উচ্চতর ক্রিকেট কর্মসূচি এবং অন্যান্য দায়িত্বের কারণে মাঝপথে দলের সাত-আটজন খেলোয়াড়কে হারাতে হয়। এতে স্বাভাবিকভাবেই দলীয় ভারসাম্যে প্রভাব পড়ে।

তবে একই পরিস্থিতি তরুণদের জন্য সুযোগও তৈরি করে। অভিজ্ঞ ক্রিকেটাররা না থাকলে নতুনরা একাদশে জায়গা পান, ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং নিজেদের সামর্থ্য দেখানোর সুযোগ পান। চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে এবার দ্বিতীয় দল থাকার বিষয়টিকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন ইয়াসির। এতে নতুন ক্রিকেটারদের লাল বলের ক্রিকেটের সঙ্গে নিয়মিতভাবে যুক্ত রাখা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করার সুযোগ বাড়বে।

রাজশাহীতে আবার নতুন নেতৃত্বের অধ্যায় শুরু হচ্ছে। অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পাওয়া প্রীতম কুমার বিষয়টি নিয়ে উচ্ছ্বসিত। দলের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার পাশাপাশি সতীর্থদের সঙ্গে সমন্বয় করে এগিয়ে যেতে চান তিনি। জাতীয় দলের ব্যস্ত সূচির কারণে সব খেলোয়াড়কে নিয়মিত পাওয়া কঠিন হলেও বর্তমান দল নিয়ে তাঁর সন্তুষ্টি রয়েছে।

প্রীতমের কাছে এবারের মৌসুমে সবচেয়ে বড় বিষয় হবে দ্রুত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। আবহাওয়া, মাঠের অবস্থা কিংবা অন্য কিছু সবসময় ক্রিকেটারদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তাই এসব পরিস্থিতি নিয়ে না ভেবে যত দ্রুত সম্ভব নিজেদের মানিয়ে নিয়ে ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়াই রাজশাহীর পরিকল্পনা। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের চেয়ে দলের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে ম্যাচ ধরে এগিয়ে যেতে চান তিনি।

সব মিলিয়ে এনসিএলের নতুন মৌসুমে প্রত্যাশার জায়গাগুলো বেশ বৈচিত্র্যময়। সিলেট শিরোপা ধরে রাখতে চায়, চট্টগ্রামের লক্ষ্যও ট্রফি। বরিশাল নিজেদের অবস্থান বদলাতে চাইছে, ঢাকা খুঁজছে ধারাবাহিকতা। ময়মনসিংহের পরিকল্পনায় রয়েছে বোলিং শক্তি পুনর্গঠন ও ক্রিকেটীয় ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা, আর খুলনা গুরুত্ব দিচ্ছে তরুণ প্রতিভা ও প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে।

এই লড়াইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জাতীয় দলের পাইপলাইন শক্ত করা। ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত ম্যাচ খেলার সুযোগ, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বোলিংয়ের মুখোমুখি হওয়া, লাল বলের ক্রিকেটে অভিজ্ঞতা অর্জন এবং সিনিয়রদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ—সবকিছু মিলিয়েই একজন তরুণ ক্রিকেটারের পরবর্তী পর্যায়ে যাওয়ার ভিত তৈরি হয়। ফলে এনসিএলের মাঠে প্রতিটি দলের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য আলাদা হলেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে বাংলাদেশের সামগ্রিক ক্রিকেট কাঠামোয়।

শিরোপার লড়াইয়ের পাশাপাশি তাই এবারের এনসিএল হয়ে উঠতে পারে নিজেদের জায়গা করে নেওয়ারও মঞ্চ। অভিজ্ঞদের নেতৃত্ব, তরুণদের পারফরম্যান্স এবং দীর্ঘ মৌসুমে ধারাবাহিকতা—এই তিনের সমন্বয়ই শেষ পর্যন্ত প্রতিটি দলের পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।