বিশ্বখ্যাত ‘টাইটানিক’ সিনেমার ‘মাই হার্ট উইল গো অন’ গান দিয়ে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া কানাডিয়ান পপসংগীতশিল্পী সেলিন ডিওন দীর্ঘ অসুস্থতার পর আবারও কনসার্টের মঞ্চে ফিরেছেন। ছয় বছর পর তার এই প্রত্যাবর্তন ঘিরে দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয় তীব্র উচ্ছ্বাস ও আবেগ। প্যারিসের লা ডিফেন্স অ্যারেনায় প্রায় ৩০ হাজার দর্শকের সামনে গান পরিবেশন করতে গিয়ে নিজেও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি ৫৮ বছর বয়সি এই শিল্পী।
দীর্ঘদিন পর প্রিয় শিল্পীকে মঞ্চে দেখে দর্শকদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। করতালি ও ভালোবাসায় ভরে ওঠে পুরো ভেন্যু। পরিবেশনা শেষে দর্শকদের প্রতিক্রিয়ায় আপ্লুত হয়ে মঞ্চেই কান্নায় ভেঙে পড়েন সেলিন ডিওন। তার এই আবেগঘন মুহূর্ত দ্রুতই অনুষ্ঠানের অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্যে পরিণত হয়।
দর্শকদের উদ্দেশে সেলিন বলেন, ‘আমি একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। কথা দিয়েছিলাম—আমি আবার মঞ্চে ফিরব। আজ আমি এখানে—আপনাদের জন্য এবং নিজের জন্য গাইছি। আপনারা আমাকে ভালোবেসেছিলেন বলেই আজ আমি এ জায়গায়।’
তার এই প্রত্যাবর্তনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ও কঠিন এক লড়াই। ২০২২ সালে সেলিন ডিওনের শরীরে ‘স্টিফ পারসন সিন্ড্রোম’ নামে বিরল একটি স্নায়বিক রোগ শনাক্ত হয়। এ রোগে শরীরের পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া এবং তীব্র খিঁচুনির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। শারীরিক জটিলতার কারণে তার স্বাভাবিক জীবনযাপন যেমন ব্যাহত হয়, তেমনি গান গাওয়ার মতো কঠিন ও নিয়ন্ত্রিত কাজও ক্রমশ দুরূহ হয়ে ওঠে।
রোগের কারণে কয়েক বছর মঞ্চ থেকে দূরে থাকতে হয়েছে তাকে। একজন পেশাদার গায়িকার জন্য কণ্ঠের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা ছিল বিশেষভাবে উদ্বেগের। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে সেলিন জানান, অনেক সময় তার মনে হতো যেন কেউ গলা টিপে ধরছে। স্বরযন্ত্রে তীব্র চাপ অনুভূত হওয়ায় উঁচু ও নিচু—দুই ধরনের সুরেই গান গাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল।
শুধু কণ্ঠস্বরেই নয়, রোগটির প্রভাব পড়েছিল তার শরীরের বিভিন্ন অংশে। সেলিনের ভাষ্য অনুযায়ী, কখনো কখনো হাত-পায়ের আঙুল এতটাই শক্ত হয়ে যেত যে সেগুলো সোজা করাও সম্ভব হতো না। শারীরিক পরিস্থিতি একপর্যায়ে এতটা গুরুতর হয়েছিল যে একবার তার বুকের পাঁজরও ভেঙে যায়।
এমন পরিস্থিতিতে মঞ্চে ফেরার প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং তা বাস্তবে পূরণ করা তার জন্য নিছক একটি সংগীত পরিবেশনা নয়। দীর্ঘ বিরতির পর হাজারো দর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে গান গাওয়া ছিল তার ব্যক্তিগত সংগ্রামেরও এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। তাই পরিবেশনা শেষে দর্শকদের ভালোবাসায় তার কান্না ছিল ফিরে আসার আনন্দ, কৃতজ্ঞতা এবং দীর্ঘ অপেক্ষার আবেগের একসঙ্গে প্রকাশ।
‘মাই হার্ট উইল গো অন’ গানটির মাধ্যমে যে শিল্পী একসময় বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন, সেই সেলিন ডিওনের জন্য প্যারিসের এই মঞ্চে ফিরে আসা তাই ক্যারিয়ারের আরেকটি আবেগঘন অধ্যায় হয়ে থাকল। দীর্ঘ অসুস্থতার পরও নিজের প্রতিশ্রুতি পূরণ করে তিনি দেখালেন, মঞ্চে ফেরার আকাঙ্ক্ষা তার কাছে কতটা গভীর ছিল।









