গাইবান্ধায় নেশার টাকা জোগাড় করতে ১১ মাস বয়সী মেয়েকে জিম্মি করে রাখার অভিযোগ উঠেছে বাবা হামিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে। শিশুটিকে নিয়ে বাবার নিখোঁজ হওয়ার পর উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন মা রোমানা আকতার ও তার স্বজনেরা। মেয়েকে উদ্ধারের জন্য শেষ পর্যন্ত আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন তিনি।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) গাইবান্ধা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১-এ শিশুটিকে উদ্ধারের আবেদন করেন রোমানা। তার আবেদন আমলে নিয়ে বিচারক নিশাত তাজনীন শিশুটিকে উদ্ধারে গাইবান্ধা সদর থানা পুলিশকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
রোমানা গাইবান্ধা পৌর এলাকার বাসিন্দা। তার স্বামী হামিদুল ইসলাম গাইবান্ধা সদর উপজেলার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ ধানঘরা গ্রামের বাসিন্দা। হামিদুলের বাবা শাজাহান মিয়া সাদুল্লাপুর উপজেলার সাহারবাজার এলাকার বাসিন্দা।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, হামিদুল মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার পর তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর আশায় পরিবারের পক্ষ থেকে বিয়ে দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে গাইবান্ধা পৌর এলাকার রোমানা আকতার জান্নাতির সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর হামিদুল স্ত্রী রোমানার পরিবারের সঙ্গে ঘরজামাই হিসেবে বসবাস শুরু করেন।
রোমানার পরিবারের আর্থিক অবস্থাও স্বচ্ছল ছিল না। সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকত। অভিযোগ রয়েছে, হামিদুল নিয়মিত কোনো কাজ করতেন না। ফলে সংসারের ব্যয়ভার চালাতে রোমানার মা ও বোনকে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করতে হতো।
এরই মধ্যে রোমানার ঘরে জন্ম নেয় একটি কন্যাশিশু। তার নাম রাখা হয় ফাতেমা আকতার জান্নাতি। শিশুটির বয়স যখন ১১ মাস, তখন গত ১৭ জুলাই ঘটে কথিত অপহরণ বা জিম্মি করে রাখার ঘটনা।
রোমানার অভিযোগ, মাদক কেনার জন্য টাকা চেয়ে প্রায়ই তার ওপর চাপ সৃষ্টি করতেন হামিদুল। টাকা না পেলে তাকে মারধরও করা হতো। এরই ধারাবাহিকতায় ১৭ জুলাই বিকেলে হামিদুল শ্বশুরবাড়িতে এসে মেয়েকে কোলে নেন। শিশুটিকে জুস কিনে দেওয়ার কথা বলে বাইরে বের হন তিনি। এরপর মেয়েকে নিয়ে আর বাড়িতে ফেরেননি।
মেয়েকে নিয়ে স্বামী কোথায় গেছেন, তা জানতে পরিবারের পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হলেও প্রথম দিকে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি বলে দাবি রোমানার। পরে মোবাইল ফোনে হামিদুল তার কাছে ৫ হাজার টাকা দাবি করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রোমানার আরও অভিযোগ, ওই টাকা না দিলে শিশুটিকে বিক্রি করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তিনি ও তার স্বজনেরা। একপর্যায়ে মেয়েকে উদ্ধারের জন্য আদালতে আবেদন করার সিদ্ধান্ত নেন রোমানা।
আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পর সোমবার রাত থেকেই শিশুটিকে উদ্ধারে অভিযান শুরু করে পুলিশ। গাইবান্ধা সদর থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা স্বপন কুমার জানান, শিশুটির সন্ধানে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে।
তবে ঘটনার বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে ভিন্ন একটি বক্তব্যও পাওয়া গেছে। গাইবান্ধা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হুদা বলেন, প্রাথমিকভাবে পুলিশের কাছে ঘটনাটি ভুয়া বলে মনে হয়েছে। তবে আদালতের নির্দেশ পাওয়ায় শিশুটিকে উদ্ধারের পাশাপাশি তার বাবাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
এখন পর্যন্ত শিশুটির অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। হামিদুল কোথায় রয়েছেন এবং শিশুটি তার সঙ্গে আছে কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়। ফলে মায়ের অভিযোগ, পুলিশের প্রাথমিক মূল্যায়ন এবং বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে কী মিল বা অমিল রয়েছে, তা তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।
এদিকে ১১ মাসের শিশুকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই ঘটনায় পরিবারটির মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। শিশুটি দীর্ঘ সময় মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় তার নিরাপত্তা নিয়েও স্বজনেরা শঙ্কিত। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশ এখন শিশুটির অবস্থান শনাক্ত করে তাকে নিরাপদে উদ্ধারের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে হামিদুলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করাও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।









