দেশের বীমা খাতে দীর্ঘদিনের বকেয়া দাবি নিষ্পত্তির হার ৫৭ শতাংশ থেকে অন্তত ৭৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। বর্তমানে বিভিন্ন বীমা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার দাবি বকেয়া রয়েছে। বিপুল এই বকেয়া দ্রুত কমিয়ে পলিসিহোল্ডারদের প্রাপ্য অর্থ ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি খাতটিতে আস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সোমবার রাজধানীতে আইডিআরএর কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সংস্থাটির চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নীভিন এ লক্ষ্য ও পরিকল্পনার কথা জানান। তবে ৭৫ শতাংশ দাবি নিষ্পত্তির লক্ষ্য ঠিক কত সময়ের মধ্যে অর্জন করা হবে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দেননি।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান জানান, বকেয়া দাবি কমাতে দুই দিক থেকে কাজ করা হচ্ছে। একদিকে বিভিন্ন বীমা কোম্পানির মালিক ও প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করে দাবি পরিশোধে থাকা বাধাগুলো চিহ্নিত ও সমাধানের চেষ্টা চলছে। এর মধ্যে পরিচালনাগত ও আইন মেনে চলার সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যাও রয়েছে। অন্যদিকে আর্থিকভাবে দুর্বল বীমা কোম্পানিগুলোর পরিস্থিতির ওপর আলাদা করে নজরদারি চালানো হচ্ছে।
সোমবারের অনুষ্ঠানটি ছিল দীর্ঘদিনের বকেয়া দাবি পরিশোধে নেওয়া বিশেষ উদ্যোগের দ্বিতীয় ধাপ। এই পর্যায়ে পাঁচটি জীবন বীমা কোম্পানির ৫ হাজার ৮৬৮ জন পলিসিহোল্ডারকে মোট ২৩ কোটি ৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
এর মধ্যে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স প্রায় ১২ কোটি টাকা দিয়েছে ৩ হাজার ৬০০ জন পলিসিহোল্ডারকে। হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স ১ হাজার ১৪৫ জনকে ৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা এবং ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ৫৮০ জনকে ৫ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স ৩০০ জনের দাবির বিপরীতে ৫৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স ২৪৩ জন পলিসিহোল্ডারকে ৫০ লাখ ১০ হাজার টাকা দিয়েছে।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, বৈধ ও দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি করা তাঁর অন্যতম অগ্রাধিকার। তাঁর মতে, পলিসিহোল্ডারদের অধিকার রক্ষা এবং বীমা খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। বীমা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা জামানত নগদায়নসহ একাধিক উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে এসব দাবি পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তিনি জানান, প্রতিটি বীমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পৃথকভাবে পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা বৈঠক করা হচ্ছে। কোন কারণে বৈধ দাবি আটকে আছে, কোথায় পরিচালনাগত দুর্বলতা রয়েছে এবং কোন ধরনের নিয়ম-সংক্রান্ত সমস্যা নিষ্পত্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দেশের মোট ৮২টি বীমা কোম্পানির মধ্যে প্রায় ৭ থেকে ৮টি জীবন বীমা কোম্পানি গুরুতর আর্থিক ও পরিচালনাগত সমস্যায় রয়েছে বলে জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান। এসব প্রতিষ্ঠানের দাবি সময়মতো পরিশোধ করতে না পারার প্রভাব পুরো বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থার ওপর পড়েছে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্যোগ শুধু সংকটে থাকা ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মাঝারি মাত্রার সমস্যায় থাকা কোম্পানিগুলোকেও নিবিড় নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে এবং তাদের আর্থিক সক্ষমতা পর্যালোচনা করে বৈধ দাবি দ্রুত পরিশোধের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।
বীমা খাতে সংস্কারে সরকারের সমর্থন
সোমবার আইডিআরএর কার্যালয় পরিদর্শন করে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংস্থাটির চলমান সংস্কার উদ্যোগের প্রশংসা করেন। বিশেষ করে বীমা খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর পদক্ষেপকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন।
দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বৈধ দাবি পরিশোধের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, পলিসিহোল্ডারদের ন্যায্য পাওনা ফেরত দেওয়া গেলে বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠনে তা বড় ভূমিকা রাখবে। গ্রাহকের আস্থা শক্তিশালী না হলে বীমা খাতের টেকসই বিকাশও কঠিন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সরকার ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে বীমা কোম্পানিগুলোকে আরও কার্যকর, দক্ষ ও গতিশীল করতে আইডিআরএকে সহযোগিতা করছে বলেও জানান মন্ত্রী। পাশাপাশি গ্রাহকের অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং সেবার মান পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সাধারণ মানুষের মধ্যে বীমা, আর্থিক নিরাপত্তা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, বীমা সেবা মানুষের কাছে আরও সহজবোধ্য, গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
দ্বিতীয় ধাপের আগে প্রথম ধাপেও দাবি পরিশোধ
বকেয়া দাবি নিষ্পত্তির বিশেষ উদ্যোগের প্রথম ধাপ বাস্তবায়ন করা হয়েছিল ৩ সেপ্টেম্বর। ওই ধাপে সাতটি জীবন বীমা কোম্পানির ২ হাজার ৫৪৯ জন পলিসিহোল্ডারের ১৪ কোটি ৫১ লাখ টাকার দাবি নিষ্পত্তিতে সহায়তা করেছিল আইডিআরএ।
প্রথম ধাপে বায়রা লাইফ, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ, গোল্ডেন লাইফ, হোমল্যান্ড লাইফ, পদ্মা ইসলামী লাইফ, প্রগ্রেসিভ লাইফ এবং সানফ্লাওয়ার লাইফের পলিসিহোল্ডারদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
আইডিআরএ জানিয়েছে, বৈধ কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অনিষ্পন্ন থাকা দাবিগুলো যাচাই-বাছাই করে পর্যায়ক্রমে পরিশোধের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। কোন দাবিগুলো প্রকৃত ও পরিশোধযোগ্য, সেগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করার পর অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
দীর্ঘদিনের বকেয়া দাবির কারণে বীমা খাতে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, সেটি কাটিয়ে ওঠার জন্য শুধু অর্থ পরিশোধই নয়, কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, পরিচালনা ব্যবস্থা, নিয়ম মেনে চলা এবং গ্রাহকসেবার মানও উন্নত করা প্রয়োজন। আইডিআরএর সাম্প্রতিক উদ্যোগে এসব বিষয়কে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।









