শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে নারী এশিয়া কাপের শিরোপা জয়ের পরও পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) সভাপতি মহসিন নাকভির কাছ থেকে ট্রফি নেয়নি ভারতীয় নারী ক্রিকেট দল। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর পরিস্থিতির মধ্যে নেওয়া এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া।
রোববার ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে ৭২ রানে হারিয়ে এশিয়া কাপ জেতে ভারত। ম্যাচ শেষে নাকভির কাছ থেকে ট্রফি গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেয় ভারতীয় দল। তবে এসিসির সহ-সভাপতি খালিদ আল জারুনির কাছ থেকে ট্রফি নিতে তারা সম্মত ছিল। নাকভি নিজের অবস্থান থেকে সরে না আসায় শেষ পর্যন্ত পুরস্কার গ্রহণের বিষয়টি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।
সাইকিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিলে পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক আরও অবনতি ঘটে। পরবর্তী সময়ে ভারত সরকারের ‘অপারেশন সিঁদুর’ পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তোলে। দুই দেশের ক্রিকেট দল বহুজাতিক প্রতিযোগিতায় মুখোমুখি হওয়া অব্যাহত রাখলেও মাঠের বাইরে তাদের সম্পর্কের ধরন বদলে গেছে। ম্যাচ শেষে দুই দলের খেলোয়াড়দের প্রচলিত হাত মেলানোর দৃশ্যও আর দেখা যাচ্ছে না।
সাইকিয়া বলেন, পেহেলগাম হামলার পর ভারতের অভ্যন্তরে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক কমিয়ে দেওয়ার বিষয়ে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছিল। এমনকি ক্রিকেটীয় সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। তবে বহুজাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের সরকারি নীতি ভিন্ন। সেই নীতির অংশ হিসেবে ভারত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলছে।
তবে বহুজাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া মানেই প্রতিপক্ষ দেশের সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা বা শর্ত মেনে নেওয়া নয়—এমন অবস্থানও স্পষ্ট করেন বিসিসিআই সচিব। তাঁর ভাষায়, ভারত খেলায় অংশ নেবে, কিন্তু দেশের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো পরিস্থিতিতে আপস করবে না।
সাইকিয়া জানান, নাকভির কাছ থেকে ট্রফি না নেওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। প্রায় এক বছর আগে পুরুষদের এশিয়া কাপ জয়ের পরও ভারতীয় দল একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এবার নারী দল সেই অবস্থানের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে একই পথ অনুসরণ করেছে।
তাঁর মতে, বিষয়টি ব্যক্তিগত কোনো বিরোধের প্রতিফলন নয়; বরং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সিদ্ধান্ত। নাকভি একই সঙ্গে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান ও এসিসির সভাপতি হওয়ায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে ভারতের অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে।
ফাইনালের দিন রয়্যাল বক্সে নাকভির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সেখানে বিসিসিআইয়ের সহ-সভাপতি রাজীব শুক্লাও ছিলেন। তবে সাইকিয়া বিষয়টিকে আলাদা কোনো ঘটনা হিসেবে দেখছেন না।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের স্বাভাবিক প্রটোকল অনুযায়ী ম্যাচ চলাকালে বিভিন্ন কর্মকর্তা ও অতিথির সঙ্গে দেখা হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। টস থেকে ম্যাচের শেষ পর্যন্ত তিনি রয়্যাল বক্সের বাইরে বসেছিলেন। পরে রাজীব শুক্লা তাঁর পাশে বসেন এবং নাকভিও এসিসির সহ-সভাপতি খালিদ আল জারুনির পাশে এসে বসেন। ফলে সেখানে সৌজন্য সাক্ষাৎ বা কথাবার্তা হওয়াকে ট্রফি গ্রহণের সিদ্ধান্তের সঙ্গে এক করে দেখার কারণ নেই বলে তাঁর বক্তব্য।
ট্রফি নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতা শেষ পর্যন্ত মেটানো সম্ভব হয়নি বলেও জানান সাইকিয়া। তবে এ নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই। তাঁর দাবি, পুরস্কার কে তুলে দেবেন সেটি ভারতের কাছে মুখ্য ছিল না; দলের মূল লক্ষ্য ছিল মাঠে জয় নিশ্চিত করা। শ্রীলঙ্কাকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে বলেই তিনি মনে করেন।
এশিয়া কাপে পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে ভারতীয় নারী দলের পারফরম্যান্সেরও প্রশংসা করেন বিসিসিআই সচিব। অপরাজিত থেকে শিরোপা জেতাকে তিনি দলের ধারাবাহিকতা ও সামর্থ্যের প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।
এশিয়া কাপ শেষ হওয়ার পর ভারতের সামনে এখন আরেকটি বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা। আইচি-নাগোয়ায় এশিয়ান গেমসের নারী টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট ইভেন্ট শুরু হবে ১৭ সেপ্টেম্বর। পরদিন কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক জাপানের মুখোমুখি হবে ভারত। ফলে এশিয়া কাপের সাফল্যের পর খুব বেশি সময় বিশ্রামের সুযোগ পাচ্ছে না চ্যাম্পিয়ন দল।









